প্রীতম দাস::
সুনামগঞ্জের দুর্গম উপজলাগুলো থেকে হাম আক্রান্ত লালচে র্যাশ, প্রচণ্ড জ্বর আর শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা নিয়ে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে ছুটে আসছে একের পর এক কোমলমতি শিশুরা। হাসপাতালের বারান্দা থেকে শুরু করে মেঝে সর্বত্রই সিটের সংকট।
একদিকে সিট না পেয়ে মেঝেতেই মৃত্যুর মুখোমুখি শিশুদের আকুতি, অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসাসামগ্রীর চরম সংকট ও কর্তৃপক্ষের সব ঠিক আছে দাবির মধ্যেও বাস্তবতার করুণ এক চিত্র দেখা যাচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগই দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। বছরের পর বছর হাওরের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা আর যোগাযোগের দুর্গমতাকে জয় করে সময়মতো পৌঁছেনি টিকাদান কার্যক্রম। ফলে যে সুরক্ষাবলয় তৈরি হওয়ার কথা ছিল তাতেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাঁক। স্বজনদের দাবি, টিকাদান কর্মসূচির সঠিক তথ্য ও সময়সূচি তারা পাননি।
বিগত জুলাই মাসেই এই হাসপাতালে রেকর্ড ৪৪৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার পর্যন্ত ৯১ জন নতুন রোগী এসে যোগ হয়েছেন, যার মধ্যে ৮১ জনই শিশু আর ১০ জন উঠতি কিশোর।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাম একটি চরম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা জরুরি। কিন্তু সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিত্র একদম উল্টো পৃথক কোনো আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় সুস্থ ও অন্য রোগীদের সাথেই মেঝেতে চাদর বিছিয়ে রাখা হচ্ছে হামের রোগীদের। এতে আরো ঝূঁকি বাড়ছে।
মেঝেতে শুয়ে থাকা তিন বছরের শিশুকন্যার পাশে বসে ক্ষোভ আর চোখে জল নিয়ে বাবা গোলাম আহমেদ বললেন, গ্রামে টিকার কোনো খবর পাইনি। বাচ্চার গায়ে লাল দানা আর জ্বর দেখে ছুটছি সদরে। সিট পাই নাই বারান্দায় চাদর বিছায়া রাখছি। ডাক্তার দিনে এক নজর আইয়া দেখে আর নার্সদের ডেকে ডেকে আনতে হয়। আর ওষুধ? স্যালাইন, ক্যানুলা থেকে শুরু করে সব বাহিরের দোকান থাইকা কিনে আনা লাগে।
একই করুণ সুর শোনা গেল ১০ বছরের হেপি আক্তারের মা লিপি বেগমের কণ্ঠে, সোমবারে ভর্তি হইছি কিন্তু হাসপাতাল থেকে পাইছি শুধু একটু গ্যাস (নেবুলাইজার)। ইনজেকশন, ক্যানুলা, স্যালাইন, কসটিভ সব দোকান থেকে কেনা। বারান্দার ঠান্ডা মেঝেতে রোগী নিয়ে পড়ে আছি।
রোগী ও স্বজনদের এমন অভিযোগের মুখে বিপরীত সুর শোনা গেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কণ্ঠে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ড. আহম্মদ হোসেন বলেন, সারা দেশে হামের প্রকোপ কমলেও আমাদের এখানে কমছে না। তবে আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দিচ্ছি এবং দ্রুতই এটি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
বিনামূল্যে ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের হাসপাতালে সব ধরনের ওষুধের পর্যাপ্ত সরকারি সরবরাহ আছে। যারা ওষুধ না পাওয়ার কথা বলছেন, তারা হয়ত ভুল বলছেন। এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রোগ ছড়ানোর পেছনে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকে দায়ী করেন তিনি।