বিশেষ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জের কয়েকজন সার ডিলারের বিরুদ্ধে সার পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেনা। কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিএডিসির গোদাম ও লেবার সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের সহায়তায় তারা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এই চক্র তাদের বরাদ্দকৃত সার এবং অন্য ডিলারদের সারও নিয়ম বহির্ভূতভাবে উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে পাচার করে দিয়ে থাকে। ফলে জলবায়ু অভিঘাতে বিপর্যস্ত হাওরের কৃষক কৃষি মওসুমে সারের সংকট মোকাবেলা করতে দিমশিম খেতে হচ্ছে। এই সময় কৃষকরা অতিরিক্ত মূল্যে সার কিনে জমিতে ব্যবহার করেন। এ ঘটনায় জড়িত ডিলারদের বিরুদ্ধে দ্রত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ বিএডিসি (বাংলাদেশ এগ্রিকালচার করপোরেশন) সূত্রে জানা গেছে গত ১০ মে বিএডিসি গুদাম থেকে নিয়ম ছাড়াই সার উত্তোলন করছিলেন জামালগঞ্জের ডিলার আবুল কালাম। তিনি ১৮ জন ডিলারের সার একাই তুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। এই সার পাচারের উদ্দেশ্যে বিলম্বে উত্তোলন করা হচ্ছিল। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পাল ঘটনাস্থলে পৌঁছে চালানটি আটক করেন। এ ঘটনায় বিএডিসি তদন্ত কমিটি গঠন করে গুদাম কর্মকর্তা ও ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে চিঠি লিখেছে। তবে এখনো আবুল কালামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এদিকে সার পাচারের অভিযোগ আছে ধর্মপাশার ডিলার শামছু মিয়া ও তাহিরপুরের বাদাঘাটের ডিলার হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও। হাফিজুরের বিরুদ্ধে সার পাচারের মামলাও চলমান আছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে এই চক্র সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গোদাম থেকে ইচ্ছেমতো সার উত্তোলন করে। অথচ সরকারি নিয়মানুযায়ী চালান কাটার পরই ওই দিন সার উত্তোলন করে কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতে গুদামজাত করতে হয়। কিন্তু কৃষি কর্মকর্তারা সেটা না করে ডিলারের কথায় এরাইভাল রিপোর্ট দিয়ে পাচারে সহযোগিতা করে আসছে। জানা গেছে উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তারা ডিলারদের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে সরেজমিন গুদামে না গিয়ে এরাইভাল রিপোর্ট না দেওয়ায় গত ১৩ মে জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছিলেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। পরে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এদিকে জামালগঞ্জের অভিযুক্ত আবুল কালামসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সার উত্তোলন করার ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে লিখিত জানিয়েছে বিএডিসি। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেনা।
হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জানান, সরকার সারে বস্তাপতি ৫ হাজার টাকার বেশি বর্তুকি দিয়ে থাকে। সরকারকে গুদামে সরবরাহকারী ঠিকাদার চক্র স্থানীয় ডিলার ও গুদামের একটি চক্রকে ম্যানেজ করে এই বর্তুকির সার প্রায়ই পাচার করে দেয়। তখন মওসুমে সুনামগঞ্জে সার সংকট দেখা দেয় এবং কৃষকরা বাধ্য হয়ে বাজার থেকে বেশিমূল্যে সার কিনতে হয়। মওসুমে সুনামগঞ্জ আব্দুজ জহুর সেতু পার করে দিলেই সিন্ডিকেট ১ লক্ষ টাকা করে পায় প্রতি ট্রাক প্রতি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার এক বস্তা সারে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা বর্তুকি দিয়ে থাকে। জানা গেছে জেলায় বিএডিসি ও বিসিআইসির ১৪৮ জন ডিলার রয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে এই ডিলারদের মধ্যে হাতেগোণা কয়েকজন সিন্ডিকেট করে সরকারে ভর্তুকির সার পাচার করে আসছে। তারা মূলত গুদাম ও গুদামে উত্তোলন করার জন্য নিয়ে আসার সময়ই সার পাচার করে থাকেন।
অভিযুক্ত ডিলার হাফিজুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলা আছে। আমি পাচার বা কোনও অনিয়মে জড়িত নই। আমার বরাদ্দের সার স্থানীয় কৃষকরা পেয়ে থাকেন।
আরেক অভিযুক্ত জামালগঞ্জের ডিলার আবুল কালাম বলেন, আমি এখন হাসপাতালে, পরে ফোন দেন। এরপরে আর তিনি ফোন ধরেননি। অপর অভিযুক্ত ধর্মপাশার শামছু মিয়া বলেন, আমার স্ট্রোক হওয়ায় অপারেশন হয়েছে। আমি এসবে জড়িত নই।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, গুদামে সারের মজুদ রেখে এরাইভাল রিপোর্ট দেওয়ায় জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তারা ডিলারদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি আমাদেরকেও জবাব দিয়েছেন। আমাদের কোন কর্মকর্তা এমন কাজ আর করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএডিসিরি সিলেট বিভাগের উপপরিচালক (সার) হুমায়ুন কবীর বলেন, সুনামগঞ্জ বা সিলেটে সার পাচারের কোনও সুযোগ নেই। যারা সার উত্তোলন নিয়ে অনিয়ম করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ডিলারদের ডিলারশিপ বাতিলের জন্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত দেওয়া হয়েছে।