1. haornews@gmail.com : admin :
শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০২:৩৯ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
ইউপি নির্বাচনে দলের তৃণমূলের রেজুলেশন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ আওয়ামী লীগের সিলেটে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৭, আহত অর্ধশতাধিক কমিটিতে ঠাঁই পাবেন না অভিযুক্ত নেতারা ‘তালিকা থেকে বাদ পড়ার খবরে মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু’, পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন খসরু ভাই, আপনাকে বিস্মৃত হতে দেবনা ।। শামস শামীম বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুকে সর্বসাধারণের শেষ বিদায় ‘বিশ্বের সেরা তিন রাষ্ট্রপ্রধানের একজন শেখ হাসিনা’ ৪৮ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের ‘টাইম স্কেল’ রিটের রায় রবিবার তরুণদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর মৃত্যুতে পরিকল্পনামন্ত্রীর শোক

জামাইবাবু, ইউ আর জ্যান্টলম্যান।। সুশান্ত দাস

  • আপডেট টাইম :: বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১, ৬.২৩ পিএম
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

গ্রাম বাংলার বিয়ে মানে হই-হুল্লু,বাদ্য-বাজনা গীত আর গান। এই গান বর-কনের আশীর্বাদ,আগমন থেকে বিয়ের সমাপ্তি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্বে চলতে থাকে। এক সময়ে বিয়েও শেষ হয় গানও শেষ হয় কিন্তু কিছু কিছু গান থেকে যায় মনের গহীনে। তেমনি এক গান “বলি ও ননদি আর দুমুঠো চাল ফেলে দে হাঁড়িতে, ঠাকুর জামাই এলো বাড়িতে”। উক্ত গানটি দিয়ে প্রথম আগমন উপলক্ষে জামাইবাবু হিসাবে ২০১৩-র ৫ মার্চ আপ্যায়ন করা হয়েছিল ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে নড়াইলের চিত্রা নদীর ধারে ভদ্রবিলা গ্রামে।আর আমরা জামাইবাবুকে জামাই হিসাবে প্রথম আপ্যায়ন করেছিলাম সম্মান স্বরূপ আমাদের বাড়ি থেকে ‘বর আহ্বান মূলক’ লঞ্চ পাঠিয়ে। সেদিনের আপ্যায়নে জামাইবাবু বর সেজে এসেছিলেন উত্তাল ভরপুরে বর্ষার ১৯৮৩সালের ১৪ই আগষ্ট,১৩৯০ বাংলার ২৮শে শ্রাবণ মাসের রবিবারে। এসেছিলেন সিলেটের খ্যাত জালালাবাদ ব্যান্ডপার্টি নিয়ে হাওরের পর হাওর পাড়ি জমিয়ে ঢাক-ঢোল পিঠিয়ে। আবদার ছিল কনে বড়দি আল্পনা দাশকে মঙ্গলাচরনের মাধ্যমে চার গ্রামের স্নানকে মিষ্টি খাওয়াইয়ে(আঙ্গারুয়া,সুখলাইন,হরিনগড় ও নওয়াগাঁও)তুলে নিবে। একটা জিনিস উল্লেখ করতে হয় সাধারনত ভাটির গ্রাম বাংলার বিয়েতে মঙ্গল ও মঙ্গলাচরন নিয়ে প্রায় সময়ই ঝামেলার সৃষ্টি হয়।

মঙ্গলাচরন মানে মঙ্গল+আচরন অর্থাৎ বিয়েতে যদি বলা হয় মেয়েকে আমরা মঙ্গল করিয়ে নিয়ে যাবো তারমানে বুঝতে হবে শুধু ধান-দুবরা,তিল-হরতকি দিয়ে আশীর্বাদ বুঝায় আর এর সাথে যদি আচরন যুক্তকরা হয় তাহলে কন্যাকে ছায়া-ব্লাউজ-অলংকারাধি সহ সবকিছু। এক কথায় কন্যাকে সাজাতে টপ টু বটম সহ কন্যার গোষ্ঠী-জ্ঞ্যাতি,গ্রাম-এলাকাকে মিষ্টি খাওয়াইয়ে সম্মান দেখানো ও আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া। যা সামর্থবানদের ছাড়া সম্ভব হয়ে উঠে না।

আশির দশকের সময়ে অত্রএলাকায় হাতেগুনা কয়েকজন পুরুষ ছাড়া নারীদের উচ্চ শিক্ষার বিদ্যাপীঠে তেমন একটা দেখা যেতো না। মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় পড়ানো মানে মেয়েদের বিয়ের বয়স পেরিয়া যাওয়া হিসাবে সমাজে ত্যাঁড়া দৃষ্টি ভঙ্গির প্রচলন ছিল। এমন প্রচলনের মাঝেই পড়াশুনা করেছেন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে গুড়াজেঠা সখীচরন দাশের মেয়ে খুশী বড়দি, সিলেট সরকারী মহিলা কলেজে প্রভাতী মেজদি(তবু)আর আল্পনা বড়দি। যদিও অন্যদুজন মেয়ে মাধ্যমিক শেষ করে কনাজেঠা দয়াময় দাশের মেয়ে শীলা দাশ শিক্ষকতা ও স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে প্রভাষিনী দাশ চাকুরীতে যুক্ত হয়েছিলেন। বড়দি আল্পনা দাশ কলেজে ভর্তির পাশাপাশি পিটিআই-তে(প্রাইমারি ট্রেনিং ইন্সটিটিউট) নিয়েছিলেন ভর্তি,পিটি-তে পেয়ে যান ফার্স্ট ক্লাস। ছিল হাঁতের লিখা দারুন। আর্ট সহ জানতেন হাঁতের কারু কাজ। জানতেন ভালমানের গান। ছিলেন সিলেট বেতারের নিয়োগ প্রাপ্ত নিয়মিত শিল্পী। আবার চাকুরীও পেয়ে যান বড়ইকান্দি সরকারী প্রাইমারি স্কুলে। উল্লেখ করতেই হয় বড়দি বাবার বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সেই স্বাধীনতাত্তোর শরনার্থী ক্যাম্প হতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও গণসংগীত পরিবেশনে থাকতেন। জামাইবাবু মানিক লাল তালুকদারের বড় ভগ্নিপতি মুক্তিযোদ্ধা বাবু অনিল দাশ ছিলেন একজন সমাজতন্ত্রের আদর্শীক। কাজ করেছেন সিলেটের বিভিন্ন ইউনিয়নের সচিব হিসাবে। বড়দিদির বহুমুখী কর্ম-প্রতিভার কথা জেনে শুরু করেন বিয়ের প্রস্তাবনা। সূচনালগ্নে বাবু মহেন্দ্র মাস্টার মানিক বাবুকে ছেলে(বর)হিসাবে সাবস্থ্য করলে বাবু সুরেশ তাং আঙ্গারুয়াতে মেয়ে দেখতে আসেন। মহেন্দ্র বাবুর প্রস্তাবনা ছিল আপনারা যেহেতু আমার নাতিনকে দেখতে এসেছেন তাহলে আপনারা চাইলে আমার দালান কোটাতে ‘মেয়ে দেখার’ ব্যবস্থা করতে পারি। শ্রদ্ধাভরে প্রতি উত্তরে সুরেশ তালুকদার বললেন তাঐ বাবু(মহেন্দ্র মাস্টার)আমার জামাতা অনিল দাশ আমাকে একটি বাক্যশুনিয়ে মুগ্ধ করে ফেলেছেন “নদীর জল ঘোলাও ভাল,জাতের মেয়ে কালোও ভাল”। আমি কমরেড শ্রীকান্ত দাশের কুঁড়ে ঘর বা আপনার দালান দেখে নয় বরং আপনার ভাতিজা কমরেডের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও তাঁর মেয়ে দেখেই-আসছি।কাজেই মেয়ে যে ঘরে জন্মেছে সেখানে আমার দেখতে কোন আপত্তি নেই। আপনি সেখানেই ব্যবস্থা করতে পারেন। অবশেষে উনারা ফাইনাল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে আমাদের পক্ষে বরকে আশীর্বাদ করতে আংটি পড়াতে যান গুড়া জেঠা সখীচরন দাশ,মনা জেঠা নবদ্বীপ দাশ,কনা জেঠা দয়াময় দাশ,মাতেব্বর জেঠা কুমুদ দাশ(কুমি),মাতেব্বর কাকা রসময় দাশ পুতুকাকা হরিপদ দাশ,রাঙ্গাকাকা হরিধন দাশ সহ গ্রামের আরো গন্যমান্য বয়োজেষ্ঠগন। আজ রাঙ্গাকাকা হরিধন দাশ ছাড়া সবাই মানিক জামাইবাবুর মতো পরপার বাসী।

জামাইবাবু মানিক লাল তালুকদার ছিলেন সুরেশ তালুকদার ও মাতা সুশীলা তালুকদারের,নয় সন্তানের মাঝে দ্বিতীয় সন্তান। তাঁরা আট ভাই এক বড়ো বোন। জন্ম ১৯৫৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। গ্রামের নাম ধর্মপাশা থানার জয়শ্রী সুখাইড় বাগবাড়ী। জীবন চলার ভাবটা ছিল কবি মাইকেল মধুসুধন দত্তের মতো। বাংলা ও ইংরেজীতে হাতের লেখা ছিল ভীষন ভাল। অবসরে পড়তেন প্রচুর বই। স্মার্টলি বলতে পারতেন ইংলিশ। সিগারেট পছন্দ করতেন গোল্ডলিফ;যদিও অবশেষে স্বাস্হ্য অবনতির জন্যে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ছিলেন প্রচন্ড যুক্তিবাদী। ক্রিকেট খেলা ভীষন প্রিয় হলেও দাবা ও তাস খেলায়ও ছিলেন পটু। দেখতাম মনযোগ দিয়ে পড়তেন ‘গেদু চাচার’কলাম।

তিনি সরাসরি কোন রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও ৭৫এর ১৫আগষ্ট এর প্রেক্ষিতে মুজিব আদর্শকে লালন করতেন। আবার বাম রাজনীতির প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিশেষ করে সিলেট মেডিকেল কলেজে কমরেড শ্রীকান্তে দাশের দেহদান,সিলেট সিপিবির “দ্রোহী সংশপ্তক” প্রকাশনার সময় ও প্রকাশনা নিয়ে খুব কৃতজ্ঞচিত্তে গল্প করতেন। গল্প করতেন বড় মেয়ে মানসীর জন্ম সময়ে সিপিবি,ছাত্র ইউনিয়নের এক ঝাঁক মেডিকেল ডাক্তারদের(ডা:নুরুল আম্বিয়া,ডা:শিকদার অনেকের নাম মনে নেই)আনন্দাবেশ ও মহা আড়ষ্টে হয় ভোজন সেবা করানোর কথা। কোন এক সময়ে বড়দিকে নিয়ে সিলেট হতে নিজ বাড়ি বাগবাড়িতে লঞ্চ দিয়ে যাওয়া পথে পরিচয় পর্বে কমরেড নজির হোসেনের জামাই বরণ হিসাবে ৫০টাকা সম্নানী ও উনার স্নেহময় আচরন পাওয়া খুব শ্রদ্ধা ভরে গল্প করতেন।

মানিক বাবুর ব্যবসা ছিল তখনকার সিলেটের লামাবাজার পয়েন্টে। নাম ছিল ‘মুন লাইট ট্র্যাভেলস’। অত:পর ডিলাক্স ফার্নিসার,স্টীল এজেন্ট,বিদেশী গরুর ফার্ম,জায়গা,গাড়ি সহ করেছেন অনেক কিছু। এতোসব কিছুর পরও এক সময়ে সব কিছু হারিয়ে হয়ে যান নি:স্ব।

পারিবারিক সূত্রে ব্যবসায়ী প্রবনতা খোঁজতে গিয়ে জানা যায় তাঁর বাবা সুরেশ তালুকদার হাওরভরা জমি চাষ করেও তখনকার সময়ে-ই(ব্রিটিশ পিরিয়ড)করতেন ধান-চালের আড়ৎগিরি,করতেন বিভিন্ন পন্য সামগ্রীর ব্যবসা। হেমন্তে নদী পথে ও বর্ষায় নৌকা ছিল উনার ব্যবসার মাধ্যম। ছিল বড় বড় হাজার মন ধারনের বেশ কয়েকটা নৌকা।

খাজনা-আদায় বিষয়ে স্থানীয় জমিদারদের পাত্তা না-দিয়ে সরাসরি ব্রিটিশদের সাথে হাত মিলিয়ে কিনে নেন তালুকি সম্পত্তি। লালচাঁন সরকারের গোষ্ঠী হওয়ায় ছিল প্রচুর লোকবল(হাওরাঞ্চলে লালচাঁন সরকারের গোষ্ঠী প্রতাপশালী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত)। ফলশ্রুতিতে বাবু সুরেশ তালুকদারের পিতা গোবিন্দ দাশ হলেও সমাজে পরিচিতি গড়ে উঠে বড় বাড়ির আদলে তালুকদার বাড়ি।

১৯৭৪ সালে রেকর্ড সংখ্যক লেটার মার্কস নিয়ে সিলেট এমসি কলেজে অধ্যায়নের পাশাপাশি ব্যবসায় জড়িয়ে, হয়ে যান সিলেট শহরের অধিবাসী। তারমানে এই নয় বাড়ি বিচ্ছিন্ন। বাড়িতে দূর্গাপূজা,বিয়ে সাদি আচার অনুষ্ঠানে সব ভাই-বান্ধব মিলে হতেন উপস্থিত। বাবা ছিলেন ধনাঢ্য ব্যক্তিত্ব প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক। হাইস্কুলে পড়ার সময়ে গরু রাখাল নিয়ে লজিং বাড়িতে থাকতেন। কারন খাওয়াতে কাঁসার বাটিতে হাত ডুবিয়ে দুধ পান ও শাইল ধানের আতপ চালের ভাতের সাথে ঘি না-খেলে খাওয়াতে রুচি হতো না,পড়ায় মন বসতো না। তাই তাঐ বাবু বাধ্য হয়ে একটি বাচুর সহ গরু এবং একজন রাখাল উনার লজিং বাড়িতে দিয়ে রাখতেন।

এমসি কলেজের ছাত্র জীবন থেকে এই মুন লাইট ট্র্যাভেলস ব্যবসায় জড়িত থাকায় এই লামাবাজার অঞ্চলের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয়ে যায়। একে অপরের আত্মীয়র সাথে হয়ে উঠে পরিচিত। কোন এক দুপুরে মানিক বাবুর সহকারী মুশাহিদ সাহেবের সংগে যাওয়া পড়ে ট্র্যাভেলসে। তখন ছিলাম অনেক ছোট শিশু বয়স। ট্র্যাভেলসে ঢুকার পর মূল অফিসের ভিতরে ঠিক মানিক বাবুর কাছে আরেকটা হাইফাই বড় ছোফার চেয়ারে আমাকে বসানো হলো। নানান ধরনের খাবার বিস্কিট,মিষ্টি,চানাচুর দিয়ে আমার টেবিলের সামনা ভরিয়ে দিল। এমন সময় মানিক বাবুর কোন এক বন্ধু আমার পরিচিতি বাবুর ‘শ্যালক’ পরিচিত করায় আমিতো ক্ষেপে যাই। আমাকে সবাই অনুনয় বিনয় করেও ক্ষেপা হতে সরাতে পারেনি। অবশেষে মুশাহিদ আবার আরেকটা রিক্সায় আমাকে বাসায় দিয়ে যান। সন্ধ্যায় মানিক বাবু বাসায় ফিরলে আমাকে শ্যালক হিসাবে গালি দেওয়ার জন্য দু:খ প্রকাশ করে রাতে খাবারের সময়ে এক টুকরো বড় মাছের ভাজা খাওয়াইয়ে মিমাংসা করলেন।

তখনকার সিলেট বলার কারন হলো ঐ সময়টাতে(আশির দশক)উনি থাকতেন কাজল শাহ্ অঞ্চলে। তখন কাজল শাহ্ হতে মেডিকেলে যেতে মূল রাস্তা ঘুরে আজকের মতো যাওয়া লাগতো না। সরাসরি মেডিকেলের বাউন্ডারী ওয়ালের নীচ দিয়ে মানুষ যাতায়াত করতে পারতো। নির্দিষ্ট গুটা কয়েক বাসা ছাড়া সারা কাজল শাহ্ ছিল উর্বর ধানী জমি।কাজল শাহ হতে রিকাবী বাজার(রিকাই বাজার)হয়ে লামা বাজার আসলে চোখে পড়ার মতো জুগলটিলার আখড়া(বর্তমানে ইস্কন)মধুশহীদ মাজার,খোলা পুলিশ লাইন(কোন ওয়াল ছিল না),বাঁশের তৈরি ধারার ছাউনি দিয়ে রিকাই বাজারের সবজি বাজার,একটা পুরাতন বেকারীর ফেক্টরী,আনোয়ার রেস্টুরেন্ট,ঠিক এর বিপরীতে স্টেডিয়ামের মূল গেইট ও গ্যালারী,রাস্তা ঘেষা দুতলায় সৈকত রেস্টুরেন্ট(তখনের সময়ে স্ট্যান্ডার্ড রেস্টুরেন্ট)এরপর মূল রাস্তার পূর্বপ্বার্শে বাঁশের আড়ত ও মদন মোহন কলেজের পুরাতন (মাঝে-একটু ভাজ/বাঁকা প্রকৃতির)শহীদ মিনার। অত:পর লামাবাজার; প্রায় পয়েন্টে মূল রোডের পূর্বপ্বার্শে শ্যামল ভিডিও,মুন ট্রেইলার্স এবং পশ্চিম প্বার্শে ছিল ‘মুন লাইট ট্র্যাভেলস’ ও আরেকটি প্রতিষ্ঠান বেকারী ফেক্টরী যার নাম ছিল মনেহয় সিঁতারা। লামা বাজার পয়েন্ট হতে একটি পূর্বদিকে জল্লারপাড় রোডের দিকে আগালেই হাতের বাম কোনে পড়তো জালালাবাদ ব্যান্ডপার্টি।

আজ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বার বার অতীতকে নাড়া দিচ্ছে । দেখতাম মধ্য বয়সেও টাই,স্যাুট কোট পড়তে বেশ ভালবাসতেন। ব্যবহার করতেন স্টাইলিশ সিকোফাইভ ঘড়ি। আমাদের পরিবারের দিক থেকে শুধু নয় উনার পরিবারের দিক হতেও কাউকে কোন কিছুতে “না” বলতে শুনিনি। উনার কাছে শিখেছি অনেক কিছু। আমার উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় ইংরেজী সাহিত্যে হতে ‘দ্যা লানসন’ নামক গল্প হতে লেখক তাঁর কল্পিত চরিত্র লেডিকে সালমনফিশ(মাছ),শ্যাম্পাইন খাওয়ানোর কাহিনীটুকু খুব ভাল ভাবে মাথায় ঢুকিয়েছিলেন। আমি লন্ডনে আসার পরও সালমন মাছ ও শ্যাম্পাইন ড্রিংকস কে মনেকরিয়ে দিয়েছিলেন। সবচেয়ে মঝার বিষয় হলো ছাত্র ইউনিয়নের ২৮ কিংবা ২৯তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন হতে আসা মুহুর্তে ২১শে বই মেলা থেকে স্যার হুমায়ুন আজাদের নিজ হাতে অটোগ্রাফ সম্বলিত দুটি বই কিনে আনছিলাম। বই দুটি দুজনে এক সাথে পর্যায়ক্রমে পড়ে ছিলাম। বই দুটি ছিল আমার অবিশ্বাস ও পাক সার জমিন সাদ বাদ। আমার কলেজ জীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূর্ণ জীবনটাই উনার কাছ থেকে কাটিয়েছি। কাজের প্রতি ছিলেন যত্নশীল। আমি যে দু-একজন হতে যতোটুকু কাজের প্রতি যত্নশীলতা শিখেছি তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হচ্ছেন মানিক বাবু। টিভিতে ধারা বাহিক সিরিয়্যাল ম্যাকগাইভার দেখতে উনি আমাকে বুঝিয়ে দিতেন। আশির দশকের শেষ বা নব্ব্ই দশকের হুমায়ুন আহমদের আলোচিত নাটক সহ ৭৫এর ১৫ই আগষ্ট,জিয়া,এরশাদের রাজনীতি নিয়ে আমাদের চুল ছেড়া বিশ্লেষন করে শুনাতেন। ছিলেন রাজনীতি সচেতন ব্যবসায়ি। সত্যি অর্থে ছিলেন বিশাল মনের মানুষ ও ভদ্র। মানবিকতায় ছিলেন উন্নত মাফকাঠিকর। পারিবারিক ভাবে ভাতৃত্ব প্রেমে ছিলেন উদাহরণ যোগ্য। ছিলেন সকলের কাছে গ্রহন যোগ্য। রেখে গিয়েছেন অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী আত্মীয় সজন,বন্ধু-বান্ধব সহ স্ত্রী আল্পনা দাশ তালুকদার(শিক্ষয়ত্রী), দুই কন্যা মানসী তালুকদার (অ্যানী) ইংরেজীতে অনার্স,মাস্টার্স(শিক্ষক) ও মৌসুমী তালুকদার(তন্বী)কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার(শিক্ষক) ও দুই ছেলে মিল্টন তালুকদার(ব্যবসায়ী) ও মিথুন তালুকদার(অধ্যয়নরত)।

আজ শুধুই স্মৃতি। কনিষ্ঠ শালিকা কবিতা দাশ জল ভরা টলমল চোখে ফুফিয়ে বলেন সামাজিক প্রথায় মানিক বাবুকে আমরা জামাইবাবু বললেও উনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। আমার শিক্ষা জীবনের শেষ সুন্দর্য্যটা বিএড,এলএলবি জামাইবাবুর উৎসাহেই সম্পন্ন করেছি। আজ আমি চেয়ারম্যান বাড়ির(বানিয়াচং,নজিপুর)বউ। আমার বিয়ের বাগদানের আশীর্বাদটুকু পর্যন্ত জামাইবাবু করে গিয়েছেন। এমন ভাবে হঠাৎ করে চলে যাওয়াটা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

স্মৃতিচারন করতে গিয়ে তৎকালীন সময়ের কিশোরী জল্পনা দাশ সরকার শ্রদ্ধাবনত কান্না-জড়িত কন্ঠে বলেন- “আমারও বিয়ে হয়েছে এখন আমি চার সন্তানের জননী। বলতে দ্বিধা নেই বড়দিদির চেয়েও জামাইবাবু অনেক ভাল ছিলেন। বাড়িতে বড়দির বিয়েটি ছিল এক অন্য রকমের বিয়ে। গ্রামবাসী এখনো বলে থাকে বিয়েতে যতোজন ব্যান্ডপার্টির লোকছিল সচরাচর বিয়েতে এতো বরযাত্রী-ই হয় না। লোক সংকুলানের জন্য গ্রামের বাড়ির পর বাড়ি ছেউলা( টিন দিয়ে তৈরি চাল)তৈরি করতে হয়েছিল। মনেপড়ে যখন আমরা জামাইবাবুকে চল্লিশ/পঞ্চাশ জন গোল বেঁধে ধামাইলের মধ্যখানে বসিয়ে ধামাইলের প্রতিযোগিতা শুরু করলাম তখন দেখি জামাইবাবুর জামাইবাবু,অতুল বাবু(খালিয়াজুড়ি,মিয়াতলী) তখনকার প্রেক্ষাপট ‘মানুষকে বিদেশ পাঠানো ও ব্যক্তিকে’ নিয়ে তাঁর মেয়ে শীলাকে দিয়ে ইনস্ট্যান্ট গান লিখে শিখাচ্ছেন। এক পর্যায়ে আমাদের কয়েকজনকে ডেকে লঞ্চে তুলে ছোটমোট মহড়াও দিলেন। পরে তাঁর মেয়ে শীলাকে দিয়ে গানটি আসরে উঠালে সারা ধামাইল আসর ‘ঝিম’ ধরে যায়। শীলার গলাও ছিল সেই রকম। শীলা সম্পর্কে ছিল জামাইবাবুর ভাগ্নি,তখন বয়সে ছিল আমাদের মতো তরুনী। এখন আমিও সাংসারিক,শীলাও সাংসারিক হাঁটা-চারিতে দেখা হলে ঐ বিয়ার স্মৃতিতে ফিরে যাই। শীলা বলে মাসী-গো তোমাদের বাড়িতে(আঙ্গারুয়া) বাবু-মামার বিয়ার কথা ভুলার নয়। সেদিনের গানটি-

“ প্রাণো সই সখী গো, পাগল করলো কুয়েতের জ্বালায়;

ও এগো ডাক্তার এসে রোগযে পায়না, রোগী ঠিকা হলো দায় ।।

বাল্লার মাঝে জগন্নাথপুর গ্রাম,সেই গ্রামেতে বসত করে রবীন্দ্র তাঁর নাম;

ও তার নাম শুনেছি,টাউটার হয়ে কুয়েতে(বিদেশে) মানুষ পাঠায় ।।

চল্লিশ হাজার টাকা গো হলে, মন আনন্দে ঢাকা চলে;

ও এগো বসত বাড়ি বিক্রি করে,বিধি যদি না মিলায়।।

ভাবিয়া অতুল বলে,না ভাবিয়া যে জন চলে ;

না ভাবিয়া যে-জন চলে,বিধি যদি না মিলায়।।”

তখনকার আরেক তরুনী কল্পনা দাশ তালুকদার(বর্তমানে ২ সন্তানের জননী)বলেন-

সামনে আসছে জামাইবাবুর জীবনাবসানের শেষ কৃত অনুষ্ঠান। তাঁর মৃত্যুতে সত্যিকার অর্থে একজন অভিভাবককে হারালাম। ছোটবেলায় জামাইবাবুকে কিছুটা ভয় পেতাম কিন্তু খুব স্নেহ করতেন। জামাইবাবু লোকসংগীত ধামাইল গান শুনতে ভীষন সাচ্ছন্দ বোধ করতেন বেড়াতে আসলেই মুচকি মুচকি হেঁসে বলতেন তোদের সংগী সাথীদের নিয়ে স্নানের ব্যবস্থা কর(জামাই স্নান)আর বল তোদের কি কি লাগবে? জামাইবাবুর আগমন মানে আমরাও মানসিক ভাবে প্রস্তুত পাঁচ কলসী জল,পাঁচটি আমপাতা আর ধান-দূবরা নিয়ে স্নান তো হবেই। শুধু যে আমরা তাও না বাড়ির পাড়া-প্রতিবেশীদের যুব-বৃদ্ধ পুরুষেরা এসে জানান দেয় কি-রে,দেখলাম তোদের বড় জামাই তো আইছে(আসছে)জামাই স্নান কবে আয়োজন হবে? গ্রামের মুরব্বীজনদের মুখে এখনো শুনা যায় প্রতি বার জামাই স্নানে মানিক বাবু নিয়ম-বিধি মোতাবেক খরচ করে যে আনন্দটুকু আমাদের দিয়ে যান তা এখনো অত্র এলাকার কোন দামান তার রেকর্ড ভাঙ্গতে পারেনি। সত্যিই মানুষটির চরিত্র ছিল বিরল। আজ সময়ের ব্যবধানে গ্রামজ এই ধামাইল গানের প্রচলন আগের মতো দেখা না গেলেও দল বেঁধে ধাপে ধাপে ধামাইল গানের রেওয়াজ এখনো বিদ্যমান।

আপনারা দেখবেন,ভাটির এই গ্রাম বাংলার আঞ্চলিক জামাই স্নানকে কয়েকটি ধাপে দেখা যায়। যেমন- আসর>বাঁশি>জলভরা>পাঁচমিশালী(বিভিন্ন গান)> ও সর্বশেষ বান্ধা(অভিমান সুলভ দাবী আদায়ে জামাই ও তাঁর ভাই-বান্ধবদের নিয়ে গান)

জামাইবাবুকে জামাই স্নানের সময় আমার গাওয়া বান্ধা-ধামাইল গানটি এখনো মনেপড়ে বলে হাউ-মাউ করে কান্নারত অবস্থায় বলেন-

“রাগ করবেন না জামাইবাবু,রাগ করবেন না আপনি;

ইউ আর জেন্টলম্যান, আমরা সবাই জানি।

দিদিকে মোর চুরি করে,আপনি হলেন আসামি;

এ কারনে থানায় গিয়ে, কেইস আমরা করি ।

যদি বলি পাইতে চান,তাতে লাগবে মিষ্টিপান;

বিবেক বলে আরো লাগবে টু-হান্ড্রেড মানি।”

আজ আর ধামাইল নয়,নয় কোন বান্ধা,নয় কোন মানি,নয় কোন অভিমান। শুধু এইটুকু বলবো যেখানেই থাকেন ভাল থাকেন জানাইবাবু। কারন ইউ আর জেন্টল ম্যান আমরা সবাই জানি।

উল্লেখ্য জামাইবাবু মানিক লাল তালুকদার রোজ রবিবার ২০২১এর ২৪শে জানুয়ারি রাত আনুমানিক ১১.৪৫ সময়ে তাঁর নিজ বাস ভবন সিলেটের বাগবাড়িতে পরলোক গমন করেন।

লেখক- সুশান্ত দাস(প্রশান্ত)

লন্ডন যুক্তরাজ্য।

ইমেইল- sushantadas62@yahoo.co.uk

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
themesbazarhaor24net
© All rights reserved © 2019 haor24.net
Theme Download From ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!