গোপাট। দুর্গম হাওরের ফসল উৎপাদন ও উৎপাদিত ফসল পরিবহনের একমাত্র চ্যানেল। কর্দমাক্ত গোপাট দিয়েই দূরের দুর্গম হাওর থেকে কৃষকরা বৈশাখে উৎপাদিত বোরো ফসল পরিবহন করেন। তবে আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক সময় দ্রুত ফসল পরিবহন করা সম্ভব হয়না। এতে কাটা ফসলও নষ্ট হয়ে যায়। গোপাট দিয়ে যাতায়াত সহজ হলে দ্রত, নিরাপদে, সহজে কৃষকরা উৎপাদিত ফসল পরিবহন করা সহজ হয়। তাই হাওরের কৃষি ও কৃষক নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তি ও সংগঠন নির্বিঘেœ ফসল পরিবহনের হাওরের গোপাট পাকাকরণ ও গোপাটের পাশে কৃত্রিম যে জলাধার রয়েছে তাও সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এবার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন হাওরের গুরুত্বপূর্ণ গোপাট নির্মাণে কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে থ্রেসিং ফ্লোর বা বোরো ধান মাড়াই করা এবং ও সানিং ফ্লোর বা মাড়াই করা ধান সহজে শুকানোর উদ্যোগও নিয়েছে। চলতি অর্থ বছর থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু হাওরে গোপাট, থ্রেসিং ফ্লোর ও সানিং ফ্লোর নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে। তবে কৃষকরা সব হাওরেই পর্যায়ক্রমে গোপাট উন্নয়নের কাজের দাবি জানিয়েছেন। প্রকল্পে হাওরে প্রায় ১০ কি.মি গোপাট স্থায়ী পাকা করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সুনামগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ‘সলিটে বভিাগে ভূ-উপরস্থি পানি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহাররে মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ প্রায় ৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগে কাজ শুরু করেছে। এই প্রকল্পটি শেষ হবে ২০২৯ সালে। প্রকল্পে হাওরের গোপাট উন্নয়নেও বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের চার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে পতিত জমি চাষাবাদ, খাল-পাহাড়ি নালা খনন, হাওরের গোপাট পাকাকরণ, কৃষক প্রশিক্ষণ প্রদানসহ নানা কার্যক্রমে কৃষি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ১৭ হাজার ১৯ হেক্টর পতিত জমির সেচ সুবিধায় আসবে। প্রায় ৫১ হাজার ৫৮ মে.টন অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদিত হবে। তবে নিরাপদে হাওরের ফসল বাড়িতে নিয়ে আসতে পারবেন কৃষকরা এই দাবির আংশিক বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্পে। একই সঙ্গে ৫টি করে থ্রেসিং ফ্লোর ও সানিং ফ্লোরও নির্মাণ করা হবে। থ্রেসিং ফ্লোর নির্মিত হবে দুর্গম হাওরে। যেখানে পাহাড়ি ঢল বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কৃষক দ্রুত ও সহজে কাটা ধান নিয়ে আসতে পারবেন এবং মাড়াই করতে পারবেন। এতে ক্ষয় ক্ষতি কমবে।
প্রকল্পর সংশ্লিষ্টরা জানান, গোপাট পাকা করণ, থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ হলে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার মুখে কাটা ফসল কম ঝূঁকিতে পড়বে। কাটা ধান মাড়াই, ঝারাই ও শুকানো সহজ হবে। গোপাট দিয়ে দ্রুত সময়ে ধান পরিবহন করা যাবে। এতে ক্ষতি কমবে এবং কৃষকের ব্যয় ও সময়ও কমে আসবে।
জানা গেছে প্রথম বছরে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৪ কিলোমিটার গোপাট পাকা করা হবে। থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ হবে ২টি করে। প্রকল্পের মোট ১০ কিলোমিটরা গোপাট ৮ ফুট প্রশস্থ করে আরসিসি ডালাই দিয়ে নির্মাণ করা হবে। এসব কাজের নক্সার চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
হাওরের গোপাট উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ফোরামে কথা বলছেন হাওর আন্দোলনের নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার। তিনি বলেন, হাওরের গোপাটকে সরকার প্রথম বারের মতো উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলাম গোপাট পাকা করা ও গোপাটের পাশের জলাধারকে প্রবাহমান করা। এতে গোপাট দিয়ে সড়ক পথে সরাসরি ধান পরিবহন করা যাবে। অন্যদিকে নৌকা দিয়েও নির্বিগ্নে পরিবহন করা যাবে। এতে হাওরের কাটা বোরো ফসল নষ্ট হবেনা। কৃষকদের খরচ ও সময় বাঁচবে। তিনি বলেন, কাজটি শুরু হয়েছে। তবে পর্যায়ক্রমে জেলার সব গুরুত্বপূর্ণ হাওরে গোপাট নির্মাণ করতে হবে। কারণ সব হাওরেই নিদিষ্ট গোপাট রয়েছে।
হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, গোপাট, থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর নির্মাণ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। তবে এই কাজটি জলবায়ু সহিষ্ণু করে টেকসই প্রকৃতির করতে হবে। হাওরের অভিজ্ঞ কৃষক ও হাওর নিয়ে যাদের জানা শোনা আছে তাদের পরামর্শ নিতে হবে। সর্বোপরি কাজটি যাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম মুক্ত হয় সেদিকে নজরদারি রাখতে হবে।
প্রকল্প পরিচালক প্রনজিত কুমার দেব বলেন, বিএডিসির ৫ বছরের এই প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাওরের কৃষি উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে হাওরের গোপাট পাকাকরণ ও থ্রেসিং ও সানিং ফ্লোর হাওরের উৎপাদিত ফসল পরিবহন, শুকানো ও মাড়াইয়ে বিরাট উপকার বয়ে আনবে। জরুরি মুহুর্তে গোপাট ও থ্রেসিং ফ্লোর কৃষকের বিরাট উপকারে আসবে।