1. haornews@gmail.com : admin :
  2. editor@haor24.net : Haor 24 : Haor 24
রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন

সুনামগঞ্জ পৌরসভার গোড়া পত্তনের কথা-২: কল্লোল তালুকদার চপল

  • আপডেট টাইম :: সোমবার, ২৮ মে, ২০১৮, ৪.৫৮ এএম
  • ১৭২ বার পড়া হয়েছে

শুরু হলো পথচলা :
সুনামগঞ্জ পৌরসভার একেবারে জন্মলগ্নের কোনো কাগজপত্র এখনও আমরা পাইনি। তবে ২৭ আগস্ট ১৯১৫ খ্রি. তারিখে অনুষ্ঠিত পৌর কমিশনারগণের একটি সভার কার্যবিবরণী থেকে পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পৌরসভা কাজ আরম্ভ করার পরপরই ‘ল্যাট্রিন ট্যাক্স’ নির্ধারণের জন্য প্রথমে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। এই উপকমিটি প্রতিবেদন পেশ করার পর প্রদত্ত রিপোর্ট পুনর্বিবেচনার জন্য অপর একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু উভয় উপকমিটির প্রতিবেদনই পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভি মাহ্ফুজ আলীর মনঃপূত হয়নি। তাই তিনি বিষয়টি সভায় উত্থাপন করেন এবং কমিশনারগণের নিকট ব্যাখ্যা করে বলেন যে, উভয় কমিটি হোল্ডিংসমূহের বার্ষিক মূল্যমান যাচাই না করে মূলত পুরাতন হারের উপর ভিত্তি করেই কর নির্ধারণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে আরও জানা যায় যে, পৌরসভা গঠিত হওয়ার পূর্বে লোক্যাল বোর্ডের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অর্থায়নের উপর ভিত্তি করে নগরের সংরক্ষণ ব্যবস্থা (conservancy in the town) পরিচালিত হতো। ভাইস চেয়ারম্যান উভয় কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত ট্যাক্সকে কাল্পনিক (fictitious) হিসাবে আখ্যায়িত করেন এবং তাঁর মতে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন না করে ট্যাক্স বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত নয়। তাই তিনি সভায় উক্ত কমিটি-দ্বয়ের প্রদত্ত প্রতিবেদন পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানান। পৌর কমিশনারগণের ঐ দিনের সভার কার্যবিবরণীর ৪নং দফার অংশবিশেষ নিম্নে উদ্ধৃত করা গেল:
‘The Vice chairman explained to the meeting that when the municipality was constituted in 1913-14, a sub-committee was appointed to assess latrine tax on 30. 05. 14. This sub-committee submitted their report on 11. 07. 14. Subsequently another sub-committee was appointed to revise the assessment. Both sub-committees made the assessment without any regard to the annual values of the holdings. They retained mostly the old rates at which voluntary subscriptions were paid to the Local Board under the old system of conservancy in the town.’ 12
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, সুনামগঞ্জ পৌরসভা ১৯১৩-১৪ খ্রি. অর্থবছরে জন্মলাভ করে। যেহেতু অর্থবছর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, তাই আমরা ধরে নিতে পারি যে, প্রতিষ্ঠানটির জন্ম তারিখ ১ জুলাই ১৯১৩ খ্রি.। এ বিষয়ে আরও প্রমাণ পাওয়া যায় পৌর কমিশনারগণের ২৩ মে ১৯১৫ খ্রি. তারিখে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী থেকে, যেখানে আমরা পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যানের নামটিও জানতে পারি। উক্ত সভার কার্যবিবরণীর ৭নং দফাটি ছিল নিম্নরূপ:
‘7. Proposed by Pandit Kalijoy Kabyatirtha and seconded by Babu Girish Chandra Dutta and carried unanimously that as the present Chairman of the Municipality Rai Abhaya Sankar Guha Bahadur is going on leave, this meeting expresses the obligation of the Municipality to him for the great interest taken by him in its affairs and in starting the Municipality and putting it on a sound foundation.’ 13
স্পষ্টতই সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান রায় অভয় শঙ্কর গুহ বাহাদুর। পৌরসভার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসাবে প্রতিষ্ঠানটিকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে তাঁর ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করা হলেও, কার্যবিবরণীর কোথাও চেয়ারম্যানের পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। বহু অনুসন্ধানের পর সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরাতন কাগজপত্রের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান মেলে। বিদ্যালয় পরিদর্শক (Inspector of Schools, Surma Valley and Hill Districts) মি. J. R. Barrow সাহেবের হাতে লেখা ছাত্রভর্তির একটি অনুমতিপত্রে অভয় শঙ্কর গুহ’র পরিচয় পাওয়া যায়। ২৩ এপ্রিল ১৯১২খ্রি. তারিখে লেখা উক্ত পত্রে মহকুমা প্রশাসক (এস.ডি.ও.) রায় অভয় শঙ্কর গুহ’র তিন পুত্র কামাক্ষ্যা শঙ্কর গুহ (৯ম শ্রেণি), গৌরী শঙ্কর গুহ (৫ম শ্রেণি) এবং নগেন্দ্র শঙ্কর গুহ (৩য় শ্রেণি)-কে জুবিলী হাই স্কুলে ভর্তির অনুমতি প্রদান করা হয়। সুতরাং এ থেকে আরও অনুমান করা যায় যে, অভয় শঙ্কর গুহ ১৯১২ সালে সুনামগঞ্জে এসডিও হিসাবে বদলি হয়ে আসেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯১৩ সালে সুনামগঞ্জ পৌরসভা গঠিত হয়। তখনকার প্রচলিত আইনানুযায়ী তিনি হন পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং বদলির পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ও কমিশনারগণের নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
চেয়ারম্যান: রায় অভয় শঙ্কর গুহ বাহাদুর, ভাইস চেয়ারম্যান: মৌলভি মাহ্ফুজ আলী, কমিশনারবৃন্দ: রায় সাহেব প্রকাশচন্দ্র পুরকায়স্থ, মৌলভি গণিউর রাজা চৌধুরী, মুন্সী কাদির বক্স, মৌলভি আব্দুল জব্বার, বাবু কালিজয় ভট্টাচার্য্য কাব্যতীর্থ, বাবু রাসগোবিন্দ চৌধুরী, বাবু সরোজবন্ধু সেন, বাবু গিরিশচন্দ্র দত্ত, বাবু নগেন্দ্রনাথ রায়, বাবু রামকুমার কুন্ডু এবং সহকারী সার্জন।
কমিশনারগণের অনেকের পরিচয় এখনও ঠিকঠাকভাবে বের করা সম্ভব হয়নি। বহু অনুসন্ধান করেও তৎকালীন অনেক নেতৃবৃন্দের উত্তরসূরীগণের কোনো হদিস পাইনি। অবশ্য এই না-পাওয়ার পেছনে রয়েছে কিছু ঐতিহাসিক মর্মান্তিক কারণ, যা সবারই জানা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে সাম্রজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার যে অভূতপূর্ব স্ফূরণ ঘটে ছিল, তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভারতবর্ষে। কিন্তু ধূর্ত ঔপনিবেশিক শাসকেরা সুকৌশলে এই নবজাগরণকে প্রতিহত করার জন্য হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কিছু স্বার্থান্ধ মানুষের সাহায্যে রোপণ করল একটি বিষবৃক্ষের চারা। সেটি সাম্প্রদায়িকতা। শাখাপ্রশাখা বিস্তার লাভ করে ক্রমশ এটি পরিণত হয় এক মহীরুহে। ফলে অচিরেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়ে পরিণত হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদে। মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে সচেতনভাবে শত শত বছরের ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করা হলো। এক পর্যায়ে আরম্ভ হলো ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার। কিন্তু “এদেশে ধর্মবিশ্বাস প্রাচীন ব্যাপার; হিন্দু মুসলমান এখানে যুগ যুগ ধরে প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস করেছে। তারা একই আকাশের রোদ-বৃষ্টি-জ্যোৎস্না ভোগ-উপভোগ করেছে, চাষ করেছে মিলেমিশে, একই বাজারহাটে কেনাবেচা করতে তাদের অসুবিধা হয়নি। শোকে দুঃখে পরস্পরকে সাহায্য করেছে, পরস্পরের উৎসবে, এমন কি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও অনায়াসে যোগ দিয়েছে, মন্দিরের ঘণ্টা মিশে গেছে আজানের ধ্বনির সাথে, কোনো গোলযোগ বাধেনি। কিন্তু বিপদ ঘটলো তখনই যখন ধর্ম চলে এলো রাজনীতিতে, অর্থাৎ যুক্ত হয়ে গেলো ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদির সঙ্গে। যে লড়াইটা হবার কথা ছিল বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ইংরেজের, সে লড়াইয়ের ভেতরে প্রবেশ করলো ভ্রাতৃঘাতী হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ।’১৪
সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধির ইতিহাসটি মর্মান্তিক। গণমানুষের প্রকৃত মুক্তির বিষয়টি উপেক্ষিত রেখে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মত্ত হয়ে ওঠল ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে। ফলে অনিবার্য হয়ে উঠল সাতচল্লিশের অতি নির্মম বিভাজন। এজন্য যে কেবল ইংরেজরাই এককভাবে দায়ী তা নয়, দায়ী হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের উপরতলার কিছু সংখ্যক স্বার্থান্ধ মানুষ, যারা নিজেদের আখের গোছানোর জন্য সাধারণ মানুষকে ভুল পথে চালিত করেছিলেন। এই ঘূর্ণিপাকে পড়ে বহু জীবন বিপন্ন হয়েছে, তছনছ হয়েছে অনেক পরিবার। ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের এই অভিঘাত সুনামগঞ্জেও এসে লাগে। উভয় সম্প্রদায়ের প্রাগ্রসর চিন্তাচেতনার মানুষেরা এই শহরে যে অনন্যসাধারণ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলেছিলেন, তার ক্রমোন্নতি বিঘ্নিত হলো। যদিও সম্প্রীতির এই শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতো কোনো হানাহানি হয়নি, তবু অনেকেই চিরতরে হলেন দেশান্তরি। ফলে সময়ের আবর্তে তাঁরা এখন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। সুনামগঞ্জ পৌরসভা গড়ে তুলায় জড়িতদের মধ্যে যাঁদের পরিচয় এখন পর্যন্ত আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, তা নূতন প্রজন্মের পাঠকের জ্ঞাতার্থে লেখার মাঝে মাঝে উল্লেখ করা হবে। তবে লেখার কলেবরের কথা বিবেচনা করে তা সংক্ষিপ্ত রাখার চেষ্টা করা হবে।
পৌরসভার প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান মৌলিভ মাহ্ফুজ আলী মোক্তার উকিলপাড়ার আলীমাবাগের আলী পরিবারের সন্তান। এই পরিবারের দু’জন পরবর্তীতে মন্ত্রী হয়েছিলেন। তাই এটি মিনিস্টার বাড়ি হিসেবেও পরিচিত। সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত জননেতা মো. আব্দুজ জহুর এই বাড়িকে সুনামগঞ্জের রাজনীতির সূতিকাগার হিসাবে আখ্যায়িত করে লেখেন, ‘জনাব মুনাওওর আলীর বাড়ীটি ছিল সুনামগঞ্জের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। রাজনীতির সব ধরণের কর্মকা- তাঁর বাড়ী থেকে পরিচালিত হত।১৫

মাহ্ফুজ আলী সাহেবের পিতা মৌলভি মুশাররফ আলী সুনামগঞ্জের প্রথম মুসলিম আইনজীবী। আদি নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। সম্ভবত ১৮৮৩ সালের দিকে কিংবা তার কিছু আগে তিনি সুনামগঞ্জ আসেন। এখানে আসার জন্য তাঁকে উৎসাহিত করেন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জী (এসডিও)। মুশাররফ আলী ও এসডিও যোগেশচন্দ্র “দুজনেই ছিলেন সঙ্গীতের ভক্ত। এভাবে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত গভীরে পৌঁছায়। ফলে চ্যাটার্জী যখন হাইলাকান্দি থেকে সুনামগঞ্জে বদলী হলেন তখন তিনি মুশাররফ আলীকে সুনামগঞ্জে যাওয়ার জন্য জেদ ধরলেন। মুশাররফ আলী তাঁর বন্ধুর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না।”১৬ সুনামগঞ্জে এসে মুশাররফ আলী স্থায়ী হয়ে যান। পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠপুত্র মাহ্ফুজ আলী পরিবারের হাল ধরেন। জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ স্মৃতিচারণ করেন, ‘মাহফুজ আলী মোক্তার সাহেব ছিলেন খুব ভালো গায়ক ও বেহালা বাদক। উর্দু ভাষায় তাঁর ছিল বিশেষ দখল। […] তাঁরই যতেœ ও চেষ্টায় তাঁর ছোট তিন ভাই, মোজাহেদ আলী, মুনাওওর আলী ও মুসাদ্দার আলী জীবনে কৃতবিদ্যা হতে পেরেছিলেন। […] আমাদের ছেলেবেলায় তাঁরা তিন ভাই একসঙ্গে সুনামগঞ্জ শহরে ভ্রমণে বের হলে তাঁদের দেখে লোকেরা বলতো ‘আলী ব্রাদার্স’ চলেছেন।’১৭ উল্লেখ যে, আলী ব্রাদার্স সুদূর আলীগড় কলেজে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। আলী ব্রাদার্সের একজন একসময় হয়ে উঠেন সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি হলেন মৌলভি মুনাওওর আলী। দীর্ঘদিন তিনি সুনামগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাছাড়া তিনি আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদ সদস্য এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দেওয়ান গণিউর রাজা চৌধুরী ও মুন্সী কাদির বক্স মিয়ার নাম বর্তমান প্রজন্মের কাছেও অজানা নয়। তবু সংক্ষেপে এই দু’জনের পরিচয় তুলে ধরা হলো। মরমী কবি দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরীর জ্যেষ্ঠপুত্র গণিউর রাজা। তিনি খানবাহাদুর উপাধি লাভ করেছিলেন এবং অনারারি ম্যাজিস্ট্রেটও ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে অধ্যাপক নন্দলাল শর্মা লেখেন, ‘বাড়িতে নিজ প্রচেষ্টায় তিনি বাংলাভাষা ও কাব্য সঙ্গীতে বিশেষ ব্যূৎপত্তি লাভ করেন। […] গণিউর রাজা গান রচনা করতেন। তাঁর রচিত গান তিনিটি খাতায় লিপিবদ্ধ ছিল। তিনি নিজেই এর নামকরণ করেছিলেন ‘গণিসঙ্গীত’।১৮
কমিশনার মুন্সী কাদির বক্স মিয়া আরপিননগরের তালুকদার বাড়ির সন্তান। পৌরসভার জন্মলগ্ন থেকে দীর্ঘদিন তিনি এর সকল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তৎকালে সুনামগঞ্জের প্রতিটি সামাজিক রাজনৈতিক কর্মকা-ে উদার মনের, অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই সমাজসেবকের সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২৬ জুন ১৯২৫ খ্রি. তারিখের সাপ্তাহিক যুগবাণীতে ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মহাপ্রয়াণ : ভারতময় শোকের উচ্ছ্বাস’ শিরোনামের সংবাদে লেখা হয়, ‘সুনামগঞ্জবাসী মৌলবী আবদুল হান্নান এম.এল.সি.’র সভাপতিত্বে এক সাধারণ সভায় সমবেত হয়ে দেশবন্ধু দাশের অকাল মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। এই শোক প্রকাশ সংবাদ, সংবাদপত্রে ও দেশবন্ধুর শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের নিকট পাঠাতে যে খরচ লেগেছে তা মিউনিসিপালিটির কমিশনার মুন্সী কাদির বক্স মিয়া একাকিই বহন করেছেন।’ উল্লেখ্য, মুন্সী কাদির বক্স মিয়া বর্তমান পৌর মেয়রের পিতামহ।

অভয় শঙ্কর গুহ’র পর পৌরসভার দ্বিতীয় চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালনকারী এসডিও সাহেবের নামটি পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারণ রেজুলেশন বইয়ে কেবল তাঁর স্বাক্ষর আছে, কার্যবিবরণীতে কোথাও নাম লেখা নেই। তাঁর সভাপতিত্বে ১৬/০৬/১৯১৫খ্রি. তারিখে পৌর কমিশনারগণের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার তৃতীয় চেয়ারম্যান ছিলেন এসডিও মৌলভি মফিজুর রহমান ই.এ.সি.। তাঁর সভাপতিত্বে প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯/০৮/১৯১৮ খ্রি. তারিখে। উল্লেখ্য যে, মফিজুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানীর পিতা। জেনারেল ওসমানী ১ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ সালে সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার উপরিউক্ত তিনজন চেয়ারম্যানই মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন আইনানুযায়ী নিয়োগকৃত (appointed)। তাছাড়া প্রথম পৌর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান ও ১১ জন কমিশনার কেউই নির্বাচিত নন, মনোনীত (nominated) সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু সুনামগঞ্জ পৌরসভার ও শহরের উন্নয়নে প্রথম পৌর বোর্ডের অবদান কোনো অংশে কম নয়। বিভিন্ন প্রকার উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা, ল্যাজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচনে ভোট প্রদান, পৌরসভার উপবিধি (Bye-law) প্রণয়ন ইত্যাদি কর্যক্রমের মাধ্যমে এই পৌর বোর্ড পৌরসভাকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। তাই দেখা যায় যে, পৌর এলাকার ভেতর অবস্থিত লোক্যাল বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব লোক্যাল বোর্ড পৌরসভার হাতে একে একে অর্পণ করতে থাকে। সমস্যাসঙ্কুল গ্রামসদৃশ একটি ছোট্ট মফস্বল শহরের উন্নয়নে পৌরসভা আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। তখনকার সময় প্রধান সমস্যাসমূহের মধ্যে ছিল ল্যাট্রিন ব্যবস্থাপনা, যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ ও মেরামত, পানীয় জলের জন্য পুকুর খনন, খানাখন্দে পরিপূর্ণ শহরের কচুরিপানা নির্মূল, সর্বসাধারণের চলাচলের রাস্তায় গবাদিপশু বিশেষ করে ঘোড়া, গরু ইত্যাদির চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বর্ষায় কামারখালী খালে ফেরি পারাপারের জন্য মাঝি নিয়োগ, আরপিননগরের সঙ্গে বাজারের যোগাযোগের জন্য বাঁশের সাঁকো নির্মাণ, নদীভাঙনের হাত থেকে শহর-রক্ষা ইত্যাদি। সীমিত তহবিল নিয়ে পৌর বোর্ড এসব সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হন। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সুনামগঞ্জ পৌরসভাকে শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে প্রথম দিককার পৌরবোর্ডের অবদান অপরিসীম। কাজেই আমরা যদি ১৯১৯ সালকে পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে চিহ্নিত করি, তবে পৌরসভার ভিত্তি নির্মাতাদের অবদানকে অস্বীকার করা হবে। অস্বীকার করা হবে পৌরসভার ধারাবাহিক বিবর্তনের দীর্ঘ ছয় বছরের ইতিহাস। একটি ঐতিহাসিক জ্বলজ্যান্ত সত্যকে কি এভাবে অস্বীকার করা আমাদের উচিত হবে?
[লেখক : আইনজীবী]
তথ্যসূত্র:
12. Proceedings of a meeting of the Municipality held on 27 August 1915, Resolution Book of Sunamganj Municipality, 1915-1921; page: 11.
13. Proceedings of a meeting of the Commissioners of the Sunamganj Municipality held on 23rd May 1915, Resolution Book of Sunamganj Municipality, 1915-1921; page: 6.
১৪. ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি; ১৯০৫-৪৭, সংহতি, দ্বিতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ খ্রি.; পৃ.৩৪

Print Friendly, PDF & Email

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর
themesbazarhaor24net
© All rights reserved © 2019 haor24.net
Theme Download From ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!