স্টাফ রিপোর্ার::
সুনামগঞ্জ জেলা শহরের চিরচেনা শান্ত পরিবেশ এখন বিষিয়ে তুলেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি যানবাহন এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে শহরের প্রধান সড়কগুলো এখন যানজটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের এই চরম ভোগান্তি নিরসনে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ শহরে চলাচলের জন্য পৌরসভা থেকে প্রায় ১,৩০০ ইজিবাইক এবং ১,৩০০ ব্যাটারিচালিত রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে শহরে প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০-এর বেশি এ ধরনের যানবাহন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্ষুদ্র আয়তনের এই শহরে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে পথচারীদের পা ফেলার জায়গা থাকছে না।
শহরের ট্রাফিক পয়েন্ট (আলফাত স্কয়ার), পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাসস্ট্যান্ড, কোর্ট পয়েন্ট, থানা পয়েন্ট এবং হাসপাতাল রোড এখন যানজটের ‘হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার কারণে মাত্র ৫ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে সময় লাগছে ২০ থেকে ৩০ মিনিট। বিশেষ করে কালীবাড়ি মোড় এলাকায় ইজিবাইকের দীর্ঘ সারি জনচলাচলকে কার্যত স্থবির করে দিচ্ছে।
আরও ভয়াবহ তথ্য মিলেছে যানবাহনের লাইসেন্স প্রক্রিয়ায়। শহরে চলাচলকারী যানবাহনের একটি বড় অংশই চলছে ভুয়া বা নকল নম্বর প্লেট ব্যবহার করে। সাম্প্রতিক এক তদন্তে প্রায় ৩০০-এর বেশি রিকশায় ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। অনেক চালক এই জালিয়াতি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেছেন, যা প্রশাসনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহরের অধিকাংশ ইজিবাইক চালকের নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা ড্রাইভিং লাইসেন্স। ট্রাফিক নিয়ম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান না থাকায় এবং বেপরোয়া গতির কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বিশেষ করে উল্টো পথে চলাচলের প্রবণতা এবং ব্রেক সিস্টেমের দুর্বলতা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও বয়স্ক পথচারীদের জীবনের জন্য নিত্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভাড়ার নৈরাজ্য; নির্দিষ্ট তালিকা না থাকায় চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায়ই ইচ্ছেমতো ভাড়া দাবি করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক ইনচার্জ হানিফ মিয়া জানান, “শহরের আয়তনের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আমরা অবৈধ ও ভুয়া নম্বর প্লেটধারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। যানজট নিরসনে ইজিবাইকের ডান পাশ বন্ধ রাখা এবং জোড়-বিজোড় নম্বর ভিত্তিক চলাচলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
এদিকে যানজট নিরসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরের প্রবেশদ্বার থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণের একটি মেগা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের পাশাপাশি কঠোর আইনি প্রয়োগ ও অবৈধ ইজিবাইক উচ্ছেদ ছাড়া এই সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।
পৌরবাসী ও সচেতন মহলের দাবি—দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন ইজিবাইকগুলো শনাক্ত করে শহর থেকে অপসারণ করা হোক এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে শহরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হোক।