বিশেষ প্রতিনিধি::
দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের বদলিতে স্বস্তি নেমে এসেছে সুনামগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষাঙ্গনে। শিক্ষকরা বলছেন ২০১৭ সালে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হয়ে সুনামগঞ্জে আসেন জাহাঙ্গীর আলম। তবে ২০২৪ সাল থেকে ৯টি উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারেরও দায়িত্ব পালন করায় এসব উপজেলার রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতের বাজেট ভূয়া ভাউচার দেখিয়ে, কোনও কর্মসূচি পালন না করে আতœসাত করা হয়েছে এমন অভিযোগ আছে। এছাড়াও অফিসের অন্যান্য বিষয়েও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকদিন আগে তড়িগড়ি করে একজনকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে রিলিজ নিয়েছেন। অবশেষে গত সপ্তাহে চেটেপুটে খেয়ে বিদায় নিয়েছেন তিনি। তবে তার দুর্নীতির বিষয়টি আড়াল করতে তড়িগড়ি করে বিদায় নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে ২০১৭ সালে দায়িত্ব নিয়ে আসার পরই জাহাঙ্গীর আলম জেলা অফিসকে বাসা বানিয়ে অবস্থান করেন। তিনি সরকারি বাসা ভাড়ার ভাতা না দিয়ে এখানেই বসবাস করছেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে জেলা অফিসের বাৎসরিক উন্নয়ন বাজেট ও রাজস্ব বাজেটের অধিকাংশ বরাদ্দ বাস্তবায়ন না করেই নয়ছয়ের অভিযোগ আছে। অফিস স্টেশনারি, আসবাবপত্রের বাজেটও না কিনে বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়েছে। অফিসের স্টেশনারি, ভ্রমণভাতারও ভূয়া ভাউচার করা হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন খাতের শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও সুপারভিশনের বরাদ্দও ভুয়া বিলে উত্তোলন করেছেন।
জানা গেছে ২০২৪ সালে মাঝামাঝি সময়ে তিনি জেলা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাশাপাশি ৯টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসেরও দায়িত্ব পান তিনি। ফলে তার দুর্নীতির খাত বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে ক্ষমতাবলে প্রতিটি উপজেলা থেকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ জেলায় নিয়ে আসেন। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ভাতা, নাস্তা ও লাঞ্চের ভাতা থেকেও নিম্নমানের খাবার খাইয়ে বরাদ্দ পকেটস্থ করেন। প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষা বর্ষ পালনের বরাদ্দ আসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তিনি ৯টি উপজেলার দায়িত্বে থাকায় ২০২৪ সাল থেকে এই বরাদ্দের পুরোটাই কর্মসূচি পালন না করেই আতœসাত করেছেন।
তবে কোথাও নামকাওয়াস্তে একটি ব্যানার করে লোক দেখানো ফটো শেষন করেছেন এমন ঘটনাও দেখা গেছে। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলার আভ্যন্তরিণ বাজেটের প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ না করেই পকেটস্থ করেছেন, বানিয়ে নিয়েছেন ভূয়া বিল ভাউচার। এছাড়াও প্রতিটি উপজেলা থেকে ট্রাভেল বিল বাবতও ২০-২৫ হাজার টাকা করে তুলে নেওয়া হয়েছে । আসবাব পত্র কেনার যে বরাদ্দ এসেছিল তা না কিনে পুরোটাই পকেটস্থ করেছেন তিনি।
তাহিরপুর হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা শিক্ষা দিবসের বিল তিনি তুলে নিয়েছেন। তবে তাহিরপুরের শিক্ষক সমাজের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে শিক্ষক দিবসে উপজেলা চত্বরে উপজেলা অফিস কেবল একটি ব্যানার নিয়ে দাড়িয়ে ফটোসেশন করেছিল। তিনি নির্দেশনা দিয়েছিলেন শুধু ব্যানার নিয়ে ফটোসেশন করার জন্য। শুধু ব্যানার বাদে যাতে বরাদ্দের কোনও অর্থ খরচ না করা হয় সেই নির্দেশনাও ছিল। বিশ্বম্ভরপুর, শাল্লা, দিরাই, দোয়ারাবাজারসহ অন্যান্য উপজেলায়ও একই ঘটনা ঘটেছে।
জানা গেছে ধর্মপাশা ও শান্তিগঞ্জ উপজেলায় শিক্ষা অফিসার থাকায় সেখানকার উন্নয়ন ও রাজস্ব বাজেটে হাত দিতে পারেননি তিনি। বাকি ৯ উপজেলার বরাদ্দ নিজে দায়িত্বে থাকায় সহজেই উত্তোলন করতে পেরেছেন। পরে এগুলোর ভূয়া ভাউচারও করে জমা দিয়েছেন তিনি।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক শাল্লার এক মাধ্যমিক শিক্ষক বলেন, আমাদের প্রশিক্ষণ ছিল উপজেলায়। প্রশিক্ষণের নির্ধারিত ভাতা থেকে টাকা কেটে রাখা হয়েছে। ৯০ টাকার বিরিয়ানি খাইয়ে বিল রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা। এভাবে শিক্ষা দিবস, স্টেশনারির বরাদ্দ, আসবাব পত্রের বরাদ্দের অর্থও আতœসাত করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ছিলেন ভদ্রবেশি দুর্নীতিবাজ। মাধ্যমিক শিক্ষাঙ্গনের সবাই জানেন তার কথা।
এদিকে সম্প্রতি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য নেবার জন্য ফোন দিলে তার সঙ্গে কথা বলার পরই কয়েকজন শিক্ষক তাকে নিয়ে নিউজ না করতে অনুরোধ করেন। তারা এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করবেন বলেও এই প্রতিবেদককে জানান।
বদলিকৃত জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি মাফ চাই, ক্ষমা চাই। যাবার বেলা এসব করবেন না। আমি যা করেছি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে করেছি। কোনও দুর্নীতি করিনি।