বিশেষ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ৮৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া সেতু ও সড়কের কাজ নতুন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে ভুয়া প্রাক্কলন (এস্টিমেট) তৈরির অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। প্রকল্প থেকে নামমাত্র কাজ করে ৩৭ কোটি ৯৯ লাখ ৫ হাজার ৬০০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের প্রতিবাদের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রকল্পের অনিয়মের চিত্র। জনসম্মুখে দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উন্মোচিত করায় তার বিরুদ্ধে লেগেছে ঠিকাদার-প্রকৌশলী সিন্ডিকেট।
সুনামগঞ্জ বিশ্বম্ভরপুর সড়কের সড়ক বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সওজ বিভাগের বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্টের জরুরি পুনর্বাসন ও পুনর্র্নিমাণে সরকার ২২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এর আওতায় সুনামগঞ্জে ৯টি সেতু ও সড়কের সংযোগস্থলের কাজের জন্য ৮৭ কোটি টাকার প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। তবে মজার বিষয় হলো এতে আগে থেকেই সম্পন্ন হওয়া আনোয়ারপুর-ফতেপুর সড়কের চারটি সংযোগস্থল, আলীপুর সেতু, নিয়ামতপুর সড়কের সেতুসহ কয়েকটি কাজ বরাদ্দ লোপাট কররে নতুন করে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০২৪ সালের ২৭ মার্চ দরপত্র আহ্বান করে ৩০ এপ্রিল তা চূড়ান্ত করা হয়। দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও কাজ পায় বদরুল ইকবাল লিমিটেড। পরে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি স্থলবন্ধর শ্রমিক লীগ নেতা আজাদ হোসেনের সঙ্গে সাবঠিকাদারি চুক্তি এবং ১১ মার্চ তাহিরপুরের শফিকুল ইসলামকে বিলসহ যাবতীয় কাজের প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে চুক্তি ও নিয়োগের সময় ঠিকাদার বদরুল ইকবাল অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই প্রকল্পে পৃথক ব্যক্তিকে সাবঠিকাদার ও প্রতিনিধি নিয়োগ এবং চুক্তি সম্পাদনের আইনী বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মূলত সওজের প্রকৌশলী ফজলে রাব্বের মাধ্যমে এসব ভূয়া চুক্তি, এস্টিমেট সম্পন্ন হয় বলে জানিয়েছেন একাধিক প্রকৌশলী ও ঠিকাদার।
প্রকল্পের বিল উত্তোলন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় আইপিসির বিপরীতে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং পরবর্তী বিলে ১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে সাবঠিকাদার আজাদ হোসেনের সঙ্গে অর্থ লেনদেন ও চেক উত্তোলন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয় মূল ঠিকাদারের। একপর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হলে ঢাকার শান্তিনগর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে সরেজমিন প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায় যাচ্ছেতাই কাজ করছেন ভূয়া সাব ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করা, ভিট বালুর বদলে হাওরের মাটি ব্যবহার েকরা হচ্ছে। বালু, সিমেন্ট, পাথর ও রডের রেশিও ঠিক নেই। এসব দেখেই জনগণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঠিকাদারকে যথাযতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এমপি নূরুল।
স্থলবন্ধর শ্রমিক লীগ নেতা ব্যবসায়ী আজাদ হোসেন বলেন, অভিযোগ, সাবঠিকাদারি দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁকে সরিয়ে শফিকুল ইসলামকে সাবঠিকাদার করা হয় এবং প্রতিবাদ করায় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। সাব ঠিকাদারী চুক্তিতেও অনিয়ম ও দুর্নীতি করে প্রকল্পের বরাদ্দ লোপাট করার ধান্দা করা হয়।
এদিকে সম্প্রতি সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট নূরুল ইসলাম নিম্নমানের কাজ ও প্রকল্পের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির বিষয়টি সামনে এসেছে বলে মনে করেন নির্বাচনী এলাকার জনগণ। তিনি ঠিকাদার ও প্রকৌশলী চক্রের দুর্নীতির গুমর ফাস করায় তারা বেপরোয়া হয়ে এমপির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন দফতরে মিথ্যা অভিযোগ করছে। এতে ক্ষোভ ও নিন্দা জানাচ্ছেন নির্বাচনী এলাকার জনগণ ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
সুনামগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররাও ফোন ধরেন নি।