মো. অলিউর রহমান:
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের পাঁচটি জেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৪টি জেলাকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ নামের একটি সামাজিক প্ল্যাটফর্ম।
আজ রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
এর মধ্যে উচ্চ ঝুঁকির জেলাগুলো হলো: ঢাকা, রংপুর, যশোর, চাঁদপুর ও নোয়াখালী।
মাঝারি ঝুঁকির জেলাগুলো হলো: গাজীপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, কুষ্টিয়া, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী ও নেত্রকোনা।
অন্যান্য জেলাগুলোকে নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
‘সম্প্রীতি যাত্রা’ জানায়, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে দুর্গাপূজা, শোভাযাত্রা, ম-প ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়িতে হামলার তথ্য বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সংগঠনটি জানায়, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মীদের উদ্যোগে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ গঠিত হয়েছে। শিগগিরই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করে মন্দির, মাজার, ধর্মীয় স্থাপনা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ শুরু হবে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা।
তিনি বলেন, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা চলেছে। ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পরও এর ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। আগাম প্রস্তুতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে মন্দির-মাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সংগঠনের প্রস্তাবিত পদক্ষেপ: সংগটনটি নানা প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সম্প্রীতি কমিটি গঠন, মনিটরিং ও তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং, গুজব প্রতিরোধে তথ্যপ্রবাহ, দ্রুত সহায়তা কাঠামো, নীতিগত সুপারিশ ও প্রতিবেদন প্রকাশ। সংগঠনটি জানায়, সম্প্রীতি যাত্রা তাৎক্ষণিক কোনো কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন, যার লক্ষ্য সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কাঠামোগত সংস্কার।
মন্দির ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অন্তর্র্বতী সরকারের কাছে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন, দ্রুত রেসপন্স টিম গঠন, গুজব প্রতিরোধ কাঠামো তৈরি, স্বচ্ছ অভিযোগ ব্যবস্থা, এবং জরুরি সহায়তা প্রদানের দাবি জানানো হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের খ-কালীন শিক্ষক মাহা মির্জা বলেন, যেসব ঘটনাগুলো আমরা বলছি, সেগুলো গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। সরকার চাইলে মব থামানো সম্ভব, কিন্তু তারা চোখ বন্ধ করে আছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভীতিকর এবং সরকার সে চেতনাকে অবজ্ঞা করছে।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংগঠনিক সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত কোনো সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের বিচার হয়নি। বরং তাদের ফ্যাসিস্ট নীতির কারণেই মাজারে হামলা বেড়েছে। সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া মুক্তি নেই।
সংবাদ সম্মেলনে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ একটি দেশব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। তারা জানায়, একটি ফ্যাক্ট-চেকিং দল গঠন করা হবে, এবং ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর স্থানীয় নাগরিক, সামাজিক সংগঠন, সংখ্যালঘু সংগঠন, সুফি-মাজার ভিত্তিক সংগঠন, বাউল-ফকির সম্প্রদায়, আদিবাসী ও নারী সংগঠন, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
এই সময় আরও উপস্থিত ছিলেন চিন্তক ও শিল্পী অরূপ রাহী, লেখক ফেরদৌস আরা রুমী প্রমুখ।