‘মনে পড়ে তোমার কঠিন নলে তন্দ্রাতুর কপালের/ মধ্যভাগ রেখে, বুকে রেখে হাত/ কেটে গেছে আমাদের জঙ্গলের কতো কালো রাত!/ মনে আছে, মনে রেখো/আমাদের সেই সব প্রেম-ইতিহাস।’ কবি হেলাল হাফিজের ‘অস্ত্র সমর্পন’ কবিতার অমর পঙক্তির মতোই ঝলমলে রক্তাক্ত ছিল একাত্তরের বীর যোদ্ধা ও সংগঠক সালেহ চৌধুরীর যুদ্ধপ্রান্তর। প্রতিদিন মৃত্যুর আলিঙ্গনে সকালের সুর্যোদয়কে বরণ করতেন তিনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুক চিতিয়ে, মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় করে যুদ্ধ করেছেন। যোদ্ধা ও সংগঠকের এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল জীবনের অধিকারী দেশখ্যাত সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী আমৃত্যু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে লড়াই করে গেছেন। আজকের এই দিনে তিনি ২০১৭ সালের এই দিনে তিনি মারা যান। দেহান্তরিত হলেও তিনি রেখে গেছেন গৌরব ও সৌরভের অবিনাশী কীর্তিগাথা। কয়েকটি থানা দখল করে সেই অস্ত্রে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধ।
১৯৭১। চারদিকে বাজছে যুদ্ধদামামা। দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখায় বিরান বাংলার জনপদ। ধর্ষিত নারীর আতচিৎকার, নির্যাতিত মানুষের হাহাকারে-বেদনায় ভারী আকাশ। মাতৃভূমিতে শ্বাপদশকুনদের প্রতিহত করতে অদম্য মনোবলে বাংলার দামাল ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়ে যুদ্ধে। তাদের অনেকেই শহীদ হয়েছেন, অনেকে যুদ্ধজয় করে এখন গৌরবের সেই জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন। হাওর-ভাটিতে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখা সাহসী যোদ্ধা ও সংগঠক সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী তখন পাকিস্তানি হানাদাররে কাছে আতঙ্কের এক নাম ছিলেন। ২০১৪ সনে ভারতের সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে সংবর্ধনা প্রদান করেছিল। মৃত্যুর আগে তিনি কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন বাংলাদেশ চাপ্টারের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। লেখক, আকিয়ে, স্থপতি, দাবাড়–, অনুবাদক সর্বত্রই ছিলেন তিনি জ্যোতির্ময়।
সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের দুর্গম ও বিস্তৃত হাওরাঞ্চল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই পথে নির্বিগ্নে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করতো মিলিশিয়া ও রাজাকারদের জন্য। দুর্গম এই এলাকার কয়েকটি থানা আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করায় সালেহ চৌধুরী টেকেরঘাট সাবসেক্টরের আঞ্চলিক অধিনাকের দায়িত্ব পান। এই অনন্য সাবসেক্টর সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা হবিগঞ্জসহ কয়েকটি আন্তজেলায় অভিযান পরিচালনা করতো। মুক্তিযুদ্ধের সময় আজমিরিগঞ্জ, দিরাই ও শাল্লা থানা দখল ও অস্ত্র সংগ্রহে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন।
একাত্তরের বিস্তৃত ও জলপথে অস্ত্রহাতে দাপিয়ে বেড়াতেন কলম সৈনিক সালেহ চৌধুরী। দেশমাতৃকার ডাকে কলম ফেলে দিয়ে হাতে তোলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। ট্রিগারে হাত রেখে নির্ভুল নিশানায় ঘাতকের একাধিক আস্তানা গুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। গেরিলা পদ্দতিতে হাওর এলাকার একাধিক থানা দখল, অস্ত্র লুণ্ঠন করে মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি বৃদ্ধিতে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তারও বিশেষ অবদান রয়েছে। একদিকে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছেন, অন্যদিকে এলাকার তরুণ যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিক প্রজ্ঞা বলে টেনে এনেছেন যুদ্ধে। এই দুর্গম এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও এলাকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা বারবার অভিযানে সাফল্য পেতেন। তিনি এই সাফল্যের নায়ক ছিলেন।
একাত্তরে সালেহ চৌধুরী ছিলেন দৈনিক বাংলার তুখোর সাংবাদিক। দায়িত্ব পালন করতেন ফিচার এডিটর হিসেবে। ৬ দফা থেকে ৭৯’র গণঅভ্যুত্থানে সালেহ চৌধুরী ছিলেন অগ্রপথিক লিখিয়ে যোদ্ধা। যুদ্ধ শুরু হলে কলম ফেলে হাতে তুলে নেন অস্ত্র। ঢাকা থেকে পালিয়ে এসে হাওরাঞ্চলে গড়ে তোলেন মুক্তিযুদ্ধের দুর্বার দুর্গ। হাওর-ভাটির সাহসী তরুণদের সংগঠিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন তিনি। তাঁদের যুদ্ধে পাঠানোর পাশাপাশি নিজেও অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেন। হাওরের জলপথ, নৌপথ নিয়ন্ত্রণ ছিল কয়েকটি মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর হাতে-যার আঞ্চিলিক অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন সালেহ চৌধুরী। তার নেতৃত্বেই জগৎজ্যোতি দাস মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তীতে রূপ নেন।
জাতীয় নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের উদ্যোগ ও সালেহ চৌধুরীর পরামর্শেই সুনামগঞ্জের টেকেরঘাটে সাব-সেক্টর গড়ে ওঠে বলে একাধিক মুক্তিযোদ্ধা জানিয়েছেন। এ সেক্টর থেকেই কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওর এলাকায় যুদ্ধ পরিচালিত হতো। হাওর উপজেলা দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর শত্রুমুক্ত করে এবং থানা থেকে অস্ত্র লুণ্ঠন করে সালেহ চৌধুরী হাওর এলাকার আঞ্চলিক অধিনায়ক নিযুক্ত হন। অস্ত্রের চেয়ে দুর্গম এলাকার যুদ্ধ কৌশল আবিষ্কার ও তরুণদের সংগঠিত করতেও অগ্রগণ্য ছিলেন তিনি।
দিরাই উপজেলার গচিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী পরিবারের সন্তান সালেহ চৌধুরী। তাঁর আরো দুই ভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক এই পরিবারের সকল সদস্যই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। সালেহ চৌধুরী জীবনে লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। ‘একাত্তরে দিরাই-শাল্লা’ নামক তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ঢাকা ত্যাগ করে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় এক সপ্তাহ হেঁটে ঢাকা থেকে দিরাই উপজেলার নিজ গ্রামে ফিরেন। তাঁর এলাকার পাকিস্তানপন্থী একটি গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও সাহস ও সাংগঠনিক প্রজ্ঞাবলে তাদের দমন করেন। তিনি দিরাই শাল্লায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গড়ে তোলেন সংগঠন। বাড়ি থেকে দিরাই সদরে এসে রাজনৈতিক সচেতন তরুণ যুবাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। এক পর্যায়ে তিনি মুজিব নগরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করার ইচ্ছে নিয়ে মে মাসে বালাট চলে আসেন।
সেখানেই দেখা হয় এলাকার অনুজপ্রতিম রাজনৈতিক সহচর ও তরুণ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে। তখন সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ তৎপরতা কেবল শুরু হয়েছে। সংগঠকরা চেষ্টা করছেন শক্তিশালী বাহিনী গঠনের। এখানেই সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরী, হোসেন বখত, আব্দুল হক, আব্দুজ জহুর, আলফাত উদ্দিন মোক্তার, এড. আব্দুর রইছ, কমরেড বরুণ রায়দের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। তাঁরাই তাঁকে এলাকায় গিয়ে তরুণদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর আহবান জানান। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তাকে আশ্বাস দেন অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় সবকিছুই যথাসময়ে সরবরাহ হবে। তারপরেই যুদ্ধ করতে ও তরুণদের সংগঠিত করতে ফিরে আসেন নিজ এলাকায়। হাতে-কলমে যেভাবে তিনি সরস গদ্য লিখতেন সেই হাতেই সমরাস্ত্র পরিচালনার তালিমও রপ্ত করেছিলেন নিপূনতার সঙ্গে। যুদ্ধমাঠে বুদ্ধি আর রণকৌশল প্রয়োগ করে বরাবরই সাফল্য পেয়েছেন তিনি। টেকেরঘাট সাব সেক্টর থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনায় আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসেবে তিনি সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার যুদ্ধ পরিচালনা করে সফল হয়েছিলেন। টেকেরঘাট সাব সেক্টর থেকেই জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে দাসপার্টির যোদ্ধারা হাওরাঞ্চল দাপিয়ে বেড়াতো।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ৫ জুলাই সালেহ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রথম সামরিক অভিযানে নামে মুক্তিবাহিনীর একটি প্রশিক্ষিত দল। অভিযানের উদ্যেক্তা পরিকল্পনাকারী ও দলনেতা ছিলেন তিনি। দালালদের তৎপরতা শুরুর আগেই এ অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যাতে শুরুতেই তাদের মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়া যায়। পাকিস্তানি সেনারা এলাকায় হানা দিবে এই খবর পেয়ে তিনি নিজ গ্রামে কড়া পাহারায় জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হয় শাল্লা থানার অস্ত্র ছিনিয়ে আনতে হবে। প্রজ্ঞা ও সাহসকে পুজি করে টেকেরঘাট সাব সেক্টরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই তাঁরা প্রথমে শাল্লা থানা আক্রমণ করে অস্ত্র লুণ্ঠন করেন। তবে বালাট সাব সেক্টর থেকে অভিযানের জন্য সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক ওবায়দুর রেজা চৌধুরী কিছু সৈন্য পাঠিয়েছিলেন বলে জানা যায়। মোট দশজন মিলে শাল্লা থানা আক্রমণ করে থানার নিয়ন্ত্রণ নেন মুক্তিযোদ্ধারা। ভোরে ঘুমন্ত পুলিশদের বেঁধে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। থানা দখলের সেই রোমহর্ষক বর্ণনা সালেহ চৌধুরীর একাধিক লেখায় রয়েছে। পরে ওখান থেকে ফিরে থানা থেকে লুণ্ঠিত ওই অস্ত্রেই দিরাই থানা আক্রমণ করে নিয়ন্ত্রণে নেন মুক্তিযোদ্ধারা। দ্রুত দুটি থানা দখল ও অস্ত্র লুণ্ঠনের ফলে সাধারণ মানুষের মনে আশার আলো জাগে। মুক্তিযোদ্ধারা উজ্জীবিত হন। ফলে সহজেই দিরাইয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি শক্তিশালী দুর্গ গড়ে ওঠে। তার পরিচালনাধীন মুক্তিবাহিনীর অতন্দ্র অবস্থানের কারণেই ওই সময় দিরাই-ময়মনসিংহ পর্যন্ত হাওর এলাকা অনেকটা মুক্তাঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হতো। জলপথ নিরাপদ ভেবে নরসিংদী, কিশোরগঞ্জের শরণার্থীরাও আশ্রয় নিতে ছুটে আসতেন দিরাইয়ে। এক সময় বাধ্য হয়ে হানাদাররা হাওরের জলপথ ঝূকিপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিল।
সালেহ চৌধুরীর সহযোদ্ধারা জানান, দিরাই শাল্লা থানা দখল করে জুলাই মাসে জগন্নাথপুর থানা, হবিগঞ্জের এবং আজমিরিগঞ্জ থানা ও রাজাকার ক্যাম্প ধ্বংস করে মুক্তিবাহিনী। থানাগুলো দখলে দাসপার্টির বিশেষ ভূমিকা ছিল। নবীগঞ্জ ও বানিয়াচং থানাও পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রনে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত বাহিনীর হাতে।
এভাবে হাওরাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সফল অপারেশনে ব্যতিব্যস্ত হয় পাক বাহিনী। থানা আক্রমণ, নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র লুণ্ঠনের কারণে ক্ষেপে যায় তারা। তারা হাওরাঞ্চলে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বড় রকমের সামরিক অভিযানের উদ্যোগ নেয়। এক পর্যায়ে বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে পাক বাহিনী দিরাই-শাল্লা থানা নিয়ন্ত্রনে নিতে হামলা চালায়। কিন্তু পাল্টা আঘাত হানেন দামাল মুক্তিযোদ্ধারাও। হাওরপথ ছাড়াও নদীপথেও প্রবলভাবে আঘাত হেনে আতঙ্ক ধরিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। এক সময় সিলেটে অবস্থানরত হানাদারদের প্রধান যোগাযোগ পথ ভৈরব, আজমিরিগঞ্জ, শেরপুর নদীপথ নিয়ন্ত্রণে নেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের শক্ত প্রতিরোধের কারণে খোদ পাকিস্তান বেতারকেন্দ্র সেপ্টেম্বর মাসে এ পথে পাকিস্তানের কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হলে সরকার দায়িত্ব নেবেনা বলে ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। দাসপার্টিসহ মুক্তিবাহিনীদের কয়েকটি বাহিনীর সাহসিকতার কারণেই পাকিস্তানি বাহিনী এ ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়েছিল বলে মুক্তিযোদ্ধারা জানান।
হাওরাঞ্চলে যুদ্ধরত তরুণ মুক্তিসেনারা উদ্ভাবনী ক্ষমতা রপ্ত করে ল্যান্ডমাইনকে জালে জড়িয়ে পানিতে ব্যবহার করতেন। নদীপথ-হাওরপথ থেকে শত্রুদের লঞ্চ, নৌকা আটকের পর রসদ লুট করে টেকেরঘাট সেক্টরে পাঠাতেন আঞ্চলিক কমান্ডার সালেহ চৌধুরী। নৌকায় শত্রুদের জন্য পাঠানো অনেক ওষুধও ধরা পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একাধিক অভিযানে। মুক্তিযোদ্ধারা আবু সুফিয়ান জানান, হাওর এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনায় সালেহ চৌধুরী একজন দক্ষ নির্দেশক ছিলেন। নিখুত যুদ্ধ পরিচালনার কারণে বারবার সফলতা পেয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। যোদ্ধা সংগঠকের অনন্য জীবনের অধিকারী ছিলেন তিনি।
সালেহ চৌধুরী সম্পর্কে দিরাই উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা প্রভাংশু চৌধুরী এক লেখায় উল্লেখ করেন আজমিরিগঞ্জ থানা ও শাল্লা থানা সালেহ চৌধুরীর নেতৃত্বেই মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নেন। অনেক রাজাকারকেও গ্রেফতার করা হয়। যার ফলে ভাটি অঞ্চলে নতুন উদ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু করেন। আজমিরিগঞ্জ অপারেশন শেষে অনেক রাজাকারকেও খতম করা হয়েছিল। এই সবই সম্ভব হয়েছিল সালেহ চৌধুরীর নিখুন পরিকল্পনার ফলে।
মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেছিলেন, বিস্তৃত ও দুর্গম হাওরাঞ্চলে আঞ্চলিক অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন সালেহ চৌধুরী। তিনি একই সঙ্গে যোদ্ধা ও সংগঠক। তিনি তার সম্মানী ভাতায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৩৬ সালের ১১ নভেম্বর দিরাই উপজেলার গচিয়া গ্রামের সম্ভান্ত চৌধুরী পরিবারে সালেহ চৌধুরীর জন্ম। তিন পুত্র সন্তানের জনক তিনি। পড়ালেখা করেছেন মৌলভীবাজার, সিলেট ও লাহোরে। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৩ সনে সমাজকল্যালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। দৈনিক বাংলার সহকারি সম্পাদক, ফিচার সম্পাক এবং সিনিয়র সহ সম্পাদক হিসেবে অবসর নেন। আমৃত্যু নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে তাকে অভিনয়ও করিয়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশিত তার অন্তত ২০টি বই রয়েছে।
(প্রতিবেদন ও ছবি: শামস শামীম)