বর্ষা শেষের পথে। স্বাভাবিক নিয়মে জল সরে যাচ্ছে। হাওর শুকিয়ে যাওয়ার পালা। প্রকৃতির এমন প্রেমময় আশীর্বাদে হাওরের জল শুকালেও চোখের জলে ভাসছে এলাকাবাসী। মা,বাব হতে পাড়া প্রতিবেশী। পরিবার স্থানীয়দের উদ্বেগ। কথা বলছিলাম শাল্লা সদরস্থ ডুমরা গ্রামের সাত তরুন-কিশোর কথা। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রোজ শুক্রবার শাল্লা বাজার হতে, ঘরে ফেরার সময় হাতে শিকল পড়ার কথা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অপরাধে তাদের জেল হাজতে পাঠানোর কথা।
প্রকৃতিগত কারণ হোক বা ভৌগলিকগত কারণ হোক ভাটির দেশ হাওরের দেশ শাল্লা। মাত্র চারটি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি। একমাত্র বোরোধান চাষাবাদ ও যৎকিঞ্চিত মৎস সম্পদ নির্ভরশীল এলাকায় উপজেলা কেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা,প্রশাসনিক কার্যক্রম, কর্ম সংস্থান, শিক্ষা, খুচরা ক্রয়-বিক্রয়,কেনাকাটা গড়েওঠায় লোকসংখ্যার বসতিও বাড়ছে। চাকুরি-বাকুরি ছাড়াও প্বার্শবর্তী হাওর,গ্রামের অনেক ধনাঢ্য কৃষক পরিবার প্রয়োজনারিক্ত ভাবেই গড়ে তুলছে বসতভিটা। ফলশ্রুতিতে সেদিনের নলখাগড়া,মেরাগাছ ঝোপঝাড়ের মাঝে একটি পোস্ট বাক্স হতে একগল্লি বাজার আজ কয়েক কিলোমিটার পরিধির শাল্লা। আজ নতুন প্রজন্মের অনেক মুখ নতুন মনেহলেও, একটু দাঁড়িয়ে দু-এক মিনিট নাম-ধাম তাৎপরিচয় খোঁজলেই একে অন্যের পরিচয় বাহির হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বংশবুনিয়াদ থেকে পূর্বপুরুষদের আদিঅন্ত জানতে পারা তেমন কষ্টসাধ্য নয়। এমনতর পরিবেশে সন্ধ্যা কিংবা রাতে,সকাল কিংবা দুপুরে স্লোগান-মিছিলের নাম ধরে বাচ্চা তরুণ কিশোরদের অপবাদের ছাপ্পা মেরে ‘সন্ত্রাস বিরোধী’আইন ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে যখন জানান দেয়া হয় তখন নিরূপায় প্রান্তজনেরা চোখের জল ফেলিয়ে যায়। টলটল করে চোখের জলে অশ্রুসিক্ত হয়। কার্তিক-অগ্রহায়ণেরটানে হাওরের জল কমলেও চোখের জলের ধারা বহমান থেকে যায়। বুক ভাঙ্গে কান্নায়। ছন্দা তালুকদার নামে এমনই একজন ‘মা’ তাঁর ভেরিফাইড ফেইসবুক আইডিতে, ছেলেকে উদ্দেশ্য করে লেখতে, চোখে পড়ে- “বর্ষণ বাবা রে! এটাই যদি পরিনতি হতো জানতাম তাহলে যেতেই দিতাম না”। কারণ প্রতিদিনের ন্যায় স্কুল মাঠের খেলা শেষে ,ঐদিন সবাই মিলে বাজারে খেয়ে, বাড়ির ফেরতপথে এমনঘটনায় শিকারে মা দিক-দিশা হারিয়ে এমন কথা বলতে বাধ্য হয়েছে। আবার অন্য আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন- “বাবা একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেল দেখি না”।
আরেকজন আরেক মায়ের অনুভূতিকে কেন্দ্র করে তাঁর ফেইসবুক আইডিতে লিখেছেন “ সবাই জয় বাংলা শ্লোগান দেওয়ার অপরাধে আছে জেল খানায়। আমার পাশের মাঝি বাড়ির ইমন এসএসসি পরিক্ষার্থী। তার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছে। আজকে দুই দিন যাবত শুধু কান্না করছে; শান্তনা দেওয়ার ভাষা আমার নেই। আমার জানামতে সহজ সরল তাঁর ছেলে । রাজনীতি বলতে বুঝেনা কারণ খুব সাধারণ ঘরের সন্তান ছেলেটা। ফুটবল খেলে ভাল সেই সুবাদে তাকে নিমন্ত্রণ করেছিল; খাওয়ার জন্য গিয়েছিল গ্রামের বন্ধুবান্ধবের সাথে, আজকে সে জেলখানায়। আজকে দেখলাম তার মা কান্না করছেন ইমন ইমন বলে, যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে । আর কান্না করে বলছে কিভাবে ছেলেকে দেখতে যাবে; মামলার খরচ কোথায় পাবে? এবং তার আরও দুটি সন্তান আছে তাদের খাবার জোগাড় করবে কীভাবে? তার স্বপ্ন ছিল ছেলে এসএসসি পরীক্ষা দিবে, ভাল রেজাল্ট করবে, ভবিষ্যতে হয়তো তার পরিশ্রম সার্থক হবে,ছেলে বড় হয়ে কোন কিছু করতে পারবে এটাই ছিল এই মায়ের আশা। আজকে কান্না করছে আর তাই বলছে”।
আইনজীবী সুব্রত দাশ উনার ভেরিফাইড ফেইসবুকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে লিখেছেন- “জয়বাংলা প্রসঙ্গে একটু নিবেদন করি। না আমার কথা নয়। অনেক বড় মানুষের কথা। বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদ তাঁর "আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন " গ্রন্থে বলেন, 'তিনটি রূপকপ্রতীক আমরা পেয়েছিলাম একাত্তরের মার্চে। একটি জাতীয় সঙ্গীত- "আমার সোনার বাঙলা, আমি তেমায় ভালোবাসি ", যেটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাব্যসৌন্দর্যমণ্ডিত জাতীয় সঙ্গীত, যাতে কোন উগ্রতা নেই, আছে শুধু প্রকৃতিপ্রেম; দ্বিতীয়টি এক অপূর্ব জাতীয় পতাকা, যাতে ছিলো সবুজের মাঝে সূর্যের মধ্যে বাঙলাদেশের মানচিত্র, তৃতীয়টি হৃদয়কাঁপানো স্বদেশজাগানো শ্লোগান : " জয় বাঙলা"। এ-তিনটি রূপকপ্রতীক দিয়ে মার্চ ও তার পরের মাসগুলো আলোড়িত ও মুখরিত ছিলো; এগুলো ছিল পুরোপুরি পাকিস্তানি চেতনার বিপরীত, এবং আবেগ ও শৈল্পিকভাবে অনেক উৎকৃষ্ট। '
হুমায়ুন আজাদ সম্ভবত মরিয়া বাঁচিয়া গিয়াছেন! ‘জয় বাংলা’ এর এমন দুর্দিন তাঁকে দেখিতে হয় নাই”!
যতদূর জানাযায় বর্ষণ তালুকদার, অনিক দাস, সৌমিত্র দাস, অভি দাস, রূপম দাস, দীপ্ত দাস সহ ইমন দাস ওরা সাত জনই একজনের চেয়ে আরেকজন খেলাধূলায় প্রিয়। বর্ষণ তালুকদার নামের ছেলেটির মা-বাবার ফেইসবুক ঘাটাতে তার শিশুবেলার ফুটবল খেলার অনেক ছবি চোখে পড়ে। ঐ দিন ওরা খেলাধুলা করে একটা ম্যাচে জয়লাভ করে। বিজয় উদযাপন করার অংশ হিসেবে তারা ২৫/৯/২০২৬ খ্রি. রাতের বেলা তাদের ক্যাপ্টেন মো. তৌকিরসহ বাজারের একটি ঘরে খাওয়া দাওয়া করে। অতঃপর তারা ডুমরা গ্রামস্থিত নিজ নিজ বাসায় ফিরছিলো। ফেরার পথে তাদের কেউ হয়ত উচ্ছ্বাস বশত জয়বাংলা স্লোগান দিয়েছিল । আর যায় কোথায়! পথিমধ্যে ছিল শাল্লা থানার অবস্থান, কয়েকজনকে সাথে সাথেই গ্রেফতার করা হয়! শুধু তাই নয় কয়েকজনকে দিবাগত রাত আনুমানিক ০১-০০ টার দিকে বাসা হতে ঘুম থেকে তুলে এনে গ্রেফতার করা হয়। স্থানীয় সংবাদ, বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল,স্থানীয়দের কাছ হতে যতদূর জানা গেছে, ছেলেরা কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়। ফুটবল খেলা জিতে "জয়বাংলা", "বাংলাদেশ জিন্দাবাদ" এ রকম কত শত স্লোগান কতোবার শোনেছি, কতোবার দিয়েছি, কোন রকম ভাবনা চিন্তা ছাড়াই, এর কি কোন ইয়াত্তা আছে! কিন্তু সে দিন যে আর নাই! তা পোলাপান এত তাড়াতাড়ি বুঝবে কিভাবে? তারা তো আর আমাদের মতো এখনও এতটা পাকেনি! রাজনীতির মারপ্যাচ বুঝার মতো বয়স যে এখনও তাদের হয়নি!
এমন পরিস্থিতিতে নাবালক এসব তরুন কিশোরদের পাশে না দাঁড়ালে, হাওরে জল শুকালেও চোখের জলে ভাসার বেদনা রাষ্ট্রের অনুভূতিতে কী লাগবে ?
সম্পাদক ও প্রকাশক : শামস শামীম, কার্যালয়: লৌকিক এন্ড শৌভিক ভবন, পাসপোর্ট অফিস রোড, মল্লিকপুর, সুনামগঞ্জ। মোবাইল: +৮৮০১৯১২১৩৪৯১৭, ইমেইল: shamsshamim1@gmail.com
© All rights reserved © 2019-2026 haor24.net