মেঘ-পাহাড়ের দেশ, কবিতার শহর—সুনামগঞ্জ।
সেই শহরের কিছু ডানা ঝাপটানো মানুষ জীবনের প্রয়োজনে ছড়িয়ে পড়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কেউ লন্ডনে, কেউ ম্যানচেস্টারে, কেউ স্কানথর্পে—কেউবা আরও দূরে। ঠিকানা বদলেছে, চারপাশের দৃশ্য বদলেছে, জীবনের ব্যস্ততা বেড়েছে; কিন্তু বুকের ভেতরের শহরটি বদলায়নি।
সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সেই মানুষগুলোই একদিন এসে জমেছিলেন টেমসের তীরে। উপলক্ষ একটি মিলনমেলা, কিন্তু অনুভূতিতে—এ যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য লন্ডনের বুকে ফিরে পাওয়া এক টুকরো সুনামগঞ্জ।
প্রয়াত কবি মমিনুল মউজদীনের সেই অমর উচ্চারণ—
“এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়?”
যে শহরকে ভালোবেসে কবি নাম দিয়েছিলেন ‘জোছনাবাদ’, সেই শহর কি আসলেই ছেড়ে যাওয়া যায়? শরীর হয়তো হাজার মাইল দূরে চলে যায়, কিন্তু মানুষের ভেতরে যে শহরের শেকড় গেঁথে থাকে—সেখান থেকে পালানোর পথ কোথায়?
সেই জোছনাবাদেরই নয়জন স্বপ্নবাজ মানুষ ছোট্ট একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ—একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। হয়তো তখন কেউ ভাবেননি, মোবাইল ফোনের পর্দায় শুরু হওয়া কথোপকথন একদিন টেমসের তীরে এতগুলো পরিচিত মুখ, এত স্মৃতি আর এত আবেগকে এক ছাদের নিচে এনে দাঁড় করাবে।
মোহাম্মদপুর থেকে তেঘরিয়া, মল্লিকপুর থেকে নবীনগর—নিজ নিজ মহল্লার পরিচয় সেদিন ছাপিয়ে গিয়েছিল আরও বড় এক পরিচয়ে। লন্ডনের বুকে বারবার উচ্চারিত হয়েছে—“আমরা সুনামগঞ্জ পৌরবাসী।”
সেখানে কে চাচা, কে ভাতিজা; কে বড় ভাই, কে ছোট ভাই; কে সিনিয়র, কে জুনিয়র; কে বড় আপা, কে ভাবী, কে বান্ধবী—সব বিশেষণ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল একটি শব্দে—সুনামগঞ্জি।
৯ আগস্ট, রবিবার। পূর্ব লন্ডনে টেমসের পাড়ে সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান মৃদুল কান্তি দাশের একতারা রেস্টুরেন্টে আয়োজন করা হয় ‘সুনামগঞ্জ পৌরবাসী ইউকে’র মিলনমেলা।
এই আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন নয়জন স্বপ্নবাজ—জুয়েল, পরাগ, নার্গিস খান, অরুপ, মুকিত, রুমিত, ফরহাদ, ফাগুন ও কাওসার। তাঁদের ছোট্ট উদ্যোগই সেদিন হয়ে উঠেছিল বহু মানুষের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার উপলক্ষ।
আর সেই টান যে কতটা গভীর, তা বোঝা গেছে অতিথিদের পথচলায়। শুধু লন্ডন নয়—সুদূর ম্যানচেস্টার, স্কানথর্পসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহর থেকে শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছেন সুনামগঞ্জের মুখ উজ্জ্বল করা প্রবাসীরা।
কারণ কিছু ডাক দূরত্ব দিয়ে মাপা যায় না।
কিছু সম্পর্কের কাছে শত মাইলের পথও খুব সামান্য।
তারপর শুরু হলো সেই চিরচেনা সুনামগঞ্জি আড্ডা।
ভরপেট খাওয়া-দাওয়া, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক, সঙ্গে বাহারি মশলার পান। এ টেবিলে গল্প, ও টেবিলে হাসির রোল। ছোট ছোট দলে জমে ওঠা আড্ডা, একসঙ্গে ছবি তোলা, বহুদিন পর দেখা পরিচিত মুখকে জড়িয়ে ধরা, পুরোনো দিনের গল্প টেনে এনে হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়া—কখনো আবার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।
কথায় কথায় ফিরে আসে ফেলে আসা শহর।
মনে হয়, এ বুঝি আর পূর্ব লন্ডন নয়!
এ যেন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সেই পরিচিত পুকুরঘাট।
কিংবা জুবিলী স্কুলের পাশ দিয়ে লঞ্চঘাটের দিকে হেঁটে যাওয়া কোনো অলস বিকেল।
এ যেন পৌর মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে সেই অন্তহীন আড্ডা—যেখানে ঘড়ির কাঁটা চলত, কিন্তু গল্প ফুরাত না।
কেউ হয়তো মনে মনে ফিরে গিয়েছিলেন কৈশোরে। কেউ তারুণ্যে। কারও চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল পুরোনো বন্ধু, পুরোনো রাস্তা, পরিচিত দোকান, হাওরের বাতাস কিংবা বৃষ্টিভেজা সুনামগঞ্জের কোনো বিকেল।
প্রবাসজীবন মানুষকে অনেক কিছু দেয়। নতুন দেশ, নতুন সম্ভাবনা, নতুন পরিচয়। কিন্তু বিনিময়ে রেখে আসতে হয় কত পরিচিত মুখ, কত প্রিয় রাস্তা, কত বিকেলের আড্ডা! তাই হাজার মাইল দূরে হঠাৎ যখন নিজের শহরের মানুষগুলো এক জায়গায় জড়ো হয়, তখন সেটি আর শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকে না—হয়ে ওঠে শেকড়ে ফেরার ক্ষণিকের যাত্রা।
একসময় ঘড়ি জানান দেয়—ফেরার সময় হয়েছে।
অনুষ্ঠানের সময় শেষ হয়।
রেস্টুরেন্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।
কিন্তু সুনামগঞ্জির আড্ডা কি এত সহজে শেষ হয়?
বিদায়ের সময়ও দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আরেকটু গল্প, বাইরে এসে আরেকটি ছবি, তারপর “আবার দেখা হবে”—বলে আরও কয়েক মিনিট।
শেষ পর্যন্ত সবাইকে ফিরতে হয়েছে নিজ নিজ শহরে, নিজ নিজ ব্যস্ততায়। কিন্তু ফিরেছেন যেন এক ধরনের অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে—আরও কিছুক্ষণ যদি থাকা যেত! আরও কিছু গল্প যদি বলা যেত!
তাই বিদায়ের মধ্যেই জন্ম নিয়েছে নতুন প্রত্যাশা।
এই আড্ডাবাজ শহরের মানুষ আবার মিলবেন।
আরও বড় পরিসরে, আরও বেশি মানুষকে নিয়ে, আরও দীর্ঘ এক আড্ডায়।
কারণ মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক, কিছু শহর কখনো পেছনে পড়ে থাকে না। শহরগুলো মানুষের সঙ্গে সঙ্গে চলে—স্মৃতিতে, ভাষায়, বন্ধুত্বে, গল্পে, হাসিতে।
আর সুনামগঞ্জ?
সে তো শুধু মানচিত্রের একটি শহর নয়।
সে এক মায়া, এক স্মৃতি, এক শেকড়, এক ভালোবাসার নাম।
তাই সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে, টেমসের তীরে দাঁড়িয়েও হয়তো মনের অজান্তে আবার উচ্চারিত হয় কবির সেই প্রশ্ন—
“এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায়?”
সত্যিই তো—
সুনামগঞ্জ ছেড়ে যাওয়া যায়, কিন্তু নিজের ভেতর থেকে সুনামগঞ্জকে সরিয়ে রাখা যায় না।
সম্পাদক ও প্রকাশক : শামস শামীম, কার্যালয়: লৌকিক এন্ড শৌভিক ভবন, পাসপোর্ট অফিস রোড, মল্লিকপুর, সুনামগঞ্জ। মোবাইল: +৮৮০১৯১২১৩৪৯১৭, ইমেইল: shamsshamim1@gmail.com
© All rights reserved © 2019-2026 haor24.net